বুধবার, জুন ২৯, ২০২২

ঐতিহাসিক উলুগ বেগ মাদরাসা

জ্ঞান-বিজ্ঞানে অবিস্মরণীয় মুসলিম ব্যক্তিত্বের কৃতিত্বের মধ্য দিয়ে আমরা খুঁজে পাই ইসলামের সোনালি অতীত। তাঁরা শুধু ইসলামের গর্ব নন; বরং মানবজাতিরও অহংকার। তেমন এক মহান গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও শিক্ষানুরাগীর নাম উলুগ বেগ। তাঁর পূর্ণ নাম মির্জা মোহাম্মদ তারেঘ বিন শাহরুখ তিনি দিগ্বিজয়ী তৈমুর লঙের পৌত্র। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবরের পূর্বপুরুষ। উলুগ বেগ অর্থই হলো ‘মহান শাসক’। তাঁর জন্ম ইরানের সুলতানিয়া শহরে। পিতামহ কর্তৃক বিজিত মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছোট্টকালে তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন। তৈমুর লঙের মৃত্যুর পর উলুগ বেগ সমরকন্দে বসবাস শুরু করেন। ১৪০৯ সালে ১৬ বছর বয়সে তিনি সমরকন্দের প্রধান প্রশাসক নিযুক্ত হন। ১৪১১ সালের মধ্যেই তিনি তৎকালীন ইরান ও উজবেকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন। উলুগ বেগ জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত গণিতের নানান শাখা-ত্রিকোণমিতি, গোলকীয় জ্যামিতি ইত্যাদির জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। তবে মহান এ বিজ্ঞানী শাসক হিসেবে যথেষ্ট দক্ষতার প্রমাণ রাখতে পারেননি। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে তিনি হেরে যান, এমনকি ১৪৪৯ সালের উলুগ বেগ ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজের পুত্রের কাছে শুধু পরাজিতই নন, নিহতও হন। মধ্য এশিয়ায় তিমুর রাজত্বকালে রেগিস্তান বর্তমান উজবেকিস্তানের অন্তর্গত প্রাচীন সমরকন্দের মূল কেন্দ্র  ছিল। ফারসি রেগিস্তান অর্থ মরুময় স্থান। এখানে একটি জনসমাগম চত্বর ছিল। এখানেই রাজকীয় ফরমান পড়ে শোনানো হতো। দৃষ্টিনন্দন ইসলামী স্থাপত্যশৈলীতে এখানে গড়ে ওঠে বিভিন্ন নামের মসজিদসহ উলুগ বেগ মাদরাসা (১৪১৭-১৪২০), তিলইয়া-কুরি মাদরাসা (১৪১৭-১৪২০), শের-দুর মাদরাসা (১৬১৯-১৬৩৬) ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে খ্যাতি ও বিস্মৃতিতে উলুগ বেগ মাদরাসা ১৫০০ শতাব্দীতে মুসলিম প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের স্থান লাভ করে। উলুগ বেগ মাদরাসা মধ্যযুগের একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র  ছিল। পারস্যের কবি, পণ্ডিত, সুফি জামি এখানে পড়াশোনা করেছেন। উলুগ বেগ স্বয়ং এ মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। এ সময় এখানে ধর্মীয় বিষয়াদির পাশাপাশি মানববিদ্যার সব শাখায় পাঠ দেওয়া হতো। যেমন—বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা, সুফিবাদ, যুক্তিবিদ্যা ইত্যাদি। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ অবধি উলুগ বেগ মাদরাসার কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। উলুগ বেগ ইসলামী সভ্যতায় প্রাচীনতম মানমন্দির নির্মাণ করান। সমরকন্দ শহরাঞ্চল ছাড়িয়ে চুপান-আতা সমভূমি ও সংলগ্ন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানমন্দিরটি অবস্থিত ছিল। ১৯০৮ সালে রুশ প্রত্নবিদ ভ্লাদিমির ভিয়ািকন এই গোলাকার ত্রিতল মানমন্দিরের ভিত ও মর্মর পাথরের এক বৃহদাকার সেক্সট্যান্টের মাটিতে প্রোথিত অংশ খুঁড়ে বের করেন। গিয়াস আল-দিন জামশেদ কাশি, কাজি জাদেহ রুমির মতো বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ এখানে কাজ করেছেন। কিন্তু উলুগ বেগের হত্যাকাণ্ড ও তাঁর রাজ্যচ্যুতির মধ্য দিয়ে ধ্বংসের অতলান্ত গভীরে হারিয়ে যায় বিখ্যাত এ মানমন্দিরও। তবে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সমসাময়িক শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যরীতি বিকাশে উলুগ বেগ ও তাঁর কীর্তির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম ও অপরিশোধ্য।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
3,372FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -spot_img

Latest Articles