মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৯, ২০২১

করোনা জয়ের তৃপ্তি যখন আত্মঘাতী

মাঝে কিছুদিন শনাক্ত ও মৃত্যু কম থাকার সুবাদে দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ে আলোচনা, সতর্কতা ও স্বাস্থ্যবিধি মানা—সবটাতেই যেন ভাটা পড়েছিল। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে শনাক্তের হার টানা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য খাতের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সতর্ক হওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন। এরই মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সব জেলায় চিঠি পাঠিয়ে সিভিল সার্জন ও অন্যদের সতর্ক করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোর করোনা ইউনিট আগের মতোই প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরিহার্য সভা বা সামাজিক আয়োজন ছাড়া অন্য সব জনসমাগম স্থগিত করতে বলা হয়েছে। এরই মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ কয়েসের করোনায় মৃত্যুতে সব মহলেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি গত মাসের ১০ তারিখে করোনার টিকাও নিয়েছিলেন এবং গত ৫ তারিখে সর্বশেষ একটি সভায় বক্তব্যও দেন। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়া এবং মারা যাওয়ার ঘটনায় অনেকটাই হতচকিত অবস্থা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতির মুখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল ঢাকার এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘টিকা নেওয়ার পর যেন মানুষের মধ্যে বেপরোয়া ভাব এসেছে। এটা আবার বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠছে। সংক্রমণ আবার বেড়ে যাচ্ছে।’ অন্য বিশেষজ্ঞরা নড়েচড়ে বসেছেন। তাঁরা বলছেন, গত ‘কয়েক মাসে মানুষের বেপরোয়া আচরণের জন্য আবার মাসুল দিতে হবে; সেদিকেই যাচ্ছে পরিস্থিতি, খারাপ পরিণতি আসছে।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব সময়ই বলছি, টিকা নিলেও মাস্ক ব্যবহার বা স্বাস্থ্যবিধি পরিহার করা যাবে না। এগুলো মেনে চলতেই হবে। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ব থেকে করোনা একেবারে বিদায় না নেবে, ততক্ষণ আমরাও ঝুঁকির বাইরে যেতে পারব না। এ ছাড়া যেভাবে দেশে আবার শনাক্ত বাড়ছে, সেটা উদ্বেগরই ব্যাপার।’ তিনি বলেন, ‘দেশে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেয়ে আমরা আবার সারা দেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দিয়েছি। পাশাপাশি প্রস্তুতি যাতে সঠিকভাবে থাকে, সে জন্য বলেছি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও গতকাল বলেছেন, তিনি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরো এক হাজার ৫১ জন শনাক্ত হয়েছে করোনায় আক্রান্ত হিসেবে। এই সময় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ১৮ হাজার ৫৮ জনের। অর্থাৎ উপসর্গ নিয়ে মানুষের ভিড় বাড়ছে পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে। হাসপাতালে আগের চেয়ে রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলছে। আইসিইউ খালি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ২৪ ঘণ্টার হিসাবে সংক্রমণের হারও বেড়ে হয়েছে ৫.৮২ শতাংশ। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই সতর্ক করছিলাম স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য। কিন্তু মানুষের মধ্যে এক ধরনের ঢিলেঢালা অবস্থা তৈরি হয়েছিল। মানুষ সতর্কতা মানতে চায়নি, যার ফল এখনই আমরা দেখতে পাচ্ছি। সংক্রমণ আবার বাড়ছে। এটি সামনে আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তবে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘দেশে বর্তমান সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্তরাজ্যের নতুন ভেরিয়েন্টের যোগসূত্র আছে বলে মনে করছি না। কারণ যেখানে আমরা ওই ভেরিয়েন্ট পেয়েছি, সেখানেই ওই রোগীর সংস্পর্শে যাঁরা ছিলেন সবাইকে পর্যবেক্ষণ করেছি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। অন্যদের মধ্যে ওই সংক্রমণ পাইনি।’ সিলেটে সংসদ সদস্যের মৃত্যুর বিষয়ে তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘যাদের আগে থেকে জটিলতা আছে। তারা করোনায় আক্রান্ত হলে অন্যদের চেয়ে ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। ফলে আমরা বারবারই বলছি বয়স্ক জনগোষ্ঠী এবং আগে থেকে জটিলতায় আক্রান্তদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। তাদের ঘরের বাইরে না যাওয়াই ভালো। আর তাদের পরিবারের অন্যদের সতর্ক থাকতে হবে তারা যেন বাইরে থেকে করোনা ঘরে না নিয়ে আসে এবং পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের বিপদে না ফেলে। যুক্তরাজ্যে শনাক্ত হওয়া করেনাভাইরাসের নতুন ধরন (স্ট্রেইন) সিলেটেও শনাক্ত হওয়ার খবরে সিলেটজুড়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। গত বুধবার আইইডিসিআর জানায়, গত ৫ জানুয়ারি যুক্তরাজ্য থেকে সিলেটে আসা এক ব্যক্তির শরীরে নতুন ধরনটি শনাক্ত হয়েছে। জিনোম সিকোয়েন্স করে নিশ্চিত হওয়া গেছে নতুন ধরনটি হচ্ছে ‘এন৫০১ওয়াই’। এ রকম পরিস্থিতিতে টিকা নিয়েও স্থানীয় সংসদ সদস্য কয়েসের মৃত্যুর ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে সিলেটবাসীকে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ সবাইকে করোনার বিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে বলছে, ‘এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’ এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাজ্যের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে আরো ১৪৭ জন প্রবাসী সিলেট এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ১৪৪ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। তিনজনের করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার প্রমাণপত্র থাকায় তাঁদের হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজির অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, গতবারও আমাদের এখানে গরমকালে করোনা ঊর্ধ্বমুখী ছিল এবং শীতে কম ছিল। এবারও গরমের শুরু থেকেই দেশে করোনা বাড়তে শুরু করেছে। ফলে সামনে করোনা আরো ঊর্ধ্বমুখী হবে এবং তা কিছুদিন থাকবে। ফলে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, টিকা নিয়েই নিজেকে করোনামুক্ত বা আর করোনায় আক্রান্ত হবে না, এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে দুই ডোজ নেওয়ার ১৪ দিন পর ছাড়া সুরক্ষা পাওয়া যাবে না বলেই সবাইকে ধরে নিতে হবে। ওই সময়ের পরও যে কেউ যেকোনো সময় আক্রান্ত হতেই পারে। সে ক্ষেত্রে জটিলতা কম হবে এবং শুধু করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকবে না। কিন্তু যারা আগে থেকেই বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে তারা টিকা নেওয়ার পরও যদি করোনায় আক্রান্ত হয়, তাহলে তাদের জন্য সেটাও ঝুঁকিপূর্ণই থেকে যাবে। ফলে এই শ্রেণির মানুষের অধিকতর সর্তক থাকার কোনো বিকল্প নেই।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles