বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২১

জনপ্রতিরোধ ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকার

জনপ্রতিরোধ ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকারসহিংস তৎপরতা চালালে হেফাজতে ইসলামকে কঠোরভাবে দমনের পথে হাঁটবে সরকার। সহিংসতায় জড়িতদের তালিকা করে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি হেফাজতের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে মাঠে থাকবেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা কালের কণ্ঠকে এমনটা জানিয়েছেন। অন্যদিকে দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিক বলেছেন, হেফাজতের প্রতি নমনীয় না হয়ে তাদের তাণ্ডব সরকারকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করতে হবে। না হলে যেকোনো সময় দেশে ভয়ংকর কিছু ঘটে যেতে পারে। আওয়ামী লীগ ও সরকারের সূত্রগুলো জানায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ দেশে আগমন ঠেকাতে হেফাজতের তাণ্ডবে চরম ক্ষুব্ধ সরকারের নীতিনির্ধারকরা। তাঁরা মনে করেছিলেন, সীমিত আকারে শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচি পালন করবে হেফাজত। কিন্তু ঢাকার বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামে যে ব্যাপক সহিংসতা ঘটবে, তা ধারণার মধ্যে ছিল না। তাণ্ডব শুরুর পরই তা কঠোরভাবে মোকাবেলার নির্দেশনা দেওয়া হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও মাঠে থেকে প্রশাসনকে সহযোগিতা করেন। এরই মধ্যে সারা দেশে, বিশেষ করে হেফাজতের শক্ত অবস্থানের এলাকাগুলোতে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রশাসনের কাজে সহযোগিতা করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাণ্ডব মোকাবেলায় আওয়ামী লীগ ও সরকার ভেতরে ভেতরে অনেক কাজ করছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এসব উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীকে আমরা কঠোরভাবে মোকাবেলা করব। সহিংসতা সৃষ্টির কোনো চেষ্টা চললে আমরা বিন্দুমাত্র ছাড় দেব না।’ গতকাল রাজধানীতে কয়েকটি অনুষ্ঠানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা হেফাজতের তাণ্ডবের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘সরকার নমনীয় নয়, ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে মাত্র। নিরাপত্তা বাহিনী চরম ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে। কিন্তু এ অবস্থা আর থাকবে না। এতিম ও ছোট্ট শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গুজব সৃষ্টি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করে উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো থেকে বিরত না হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘হরতাল ডেকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সুন্দর, শান্তিপূর্ণ দেশ পরিচালনা ব্যাহত করতেই এসব অপচেষ্টা। শুধু হেফাজত নয়, বাঁশের কেল্লার সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যারা আগে সন্ত্রাস ও জঙ্গি সংগঠন করেছিল, তারাও প্রতিনিধিত্ব করছে। রণকৌশল জানান দিচ্ছে—এতে জামায়াত-শিবির, হরকাতুল জিহাদ ও বিএনপির মদদ থাকতে পারে।’ তিনি গতকাল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘যারা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন নষ্ট করার চেষ্টা করছে, তারা অবশ্যই বাংলাদেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখাচ্ছে না। কোনো ক্ষুদ্র গোষ্ঠীরও বক্তব্য দিতে বাধা দেব না; কিন্তু জনগণের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করা হলে, আইন অমান্য করে ভাঙচুর ও আক্রমণ চালানো হলে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।’ তিনি গতকাল ঢাকায় বেপজার একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন। জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাণ্ডবকারীদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। আমরা একদিকে যেমন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেব, অন্যদিকে জনসচেতনতা তৈরি করব। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে এই দেশবিরোধী শক্তিকে মোকাবেলা করব। ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে পারলে এই গোষ্ঠী এমনিতেই বিলীন হয়ে যাবে।’ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশবিরোধী চক্রটি এখন নতুন করে ষড়যন্ত্রে নেমেছে। মাদরাসার কোমলমতি শিশুদের হিংস্র করে তুলছে। এর বিরুদ্ধে সরকার যেমন কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে, তেমনি দেশবাসীকেও সচেতন হতে হবে।’ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের কার্যালয়ে লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের তাণ্ডবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনকালে হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যারা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়েছে তারা কার্যত স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আসুন স্বাধীনতাবিরোধীদের রুখে দাঁড়াই।’ তিনি গতকাল এক ফেসবুক পোস্টে এ কথা লেখেন। জানতে চাইলে সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ আরাফাত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারকে খুবই কঠোর হতে হবে। তাণ্ডবকারীরা এ দেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি। ওরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মিকে সঙ্গে নিয়েও আমাদের পরাজিত করতে পারেনি। এখনো পারবে না। তারা এ দেশের সেক্যুলার চরিত্রকে নষ্ট করতে চায়। আমাদের উচিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব প্রগতিশীল শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মোকাবেলা করা। আর সামাজিকভাবে বিভিন্ন মহল থেকে এসব উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।’ গতকাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজপথে অবস্থান নেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ কৃষক লীগের উদ্যোগে এক বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে আশপাশের এলাকা প্রদক্ষিণ করে আবারও দলীয় কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়। এ ছাড়া রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতেও অবস্থান নেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। রাজধানীতে তাণ্ডববিরোধী মিছিল-সমাবেশ করেছে ১৪ দলের শরিক জাসদও। গতকাল সকালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে আশপাশের এলাকা ঘুরে আবারও জাসদ কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles