মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৯, ২০২১

নামে ‘স্মল’ ঠগ বিশাল

ব্যাংকের মতোই অবয়ব, তবে নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন। সারা দেশে সুসজ্জিত শাখা, সেখানে প্রকাশ্যে ঝুলছে সাইনবোর্ড। আছে তথ্যসমৃদ্ধ আধুনিক ওয়েবসাইট। এফডিআর রসিদ, জমার বই কিংবা চেকবই—সব কিছুতেই চাকচিক্য। উচ্চ মুনাফার টোপ ফেলে আমানত সংগ্রহের নামে দিনের পর দিন কাটা হচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট। প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরির সুযোগের ছুতায় প্রার্থীদের কাছ থেকেও হাতানো হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। ‘মাকাল ফল’ প্রতিষ্ঠানটির নাম স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ (এসটিসি) ব্যাংক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির নামের সঙ্গে ‘স্মল’ জুড়ে দেওয়া হলেও তাদের ঠগবাজি বিশাল! অফিশিয়াল লোগোতে ‘দারিদ্র্যতা দূরীকরণে আমরা…’ বলা হলেও উল্টো প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা করছেন নিজেদের পকেট উন্নয়ন। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ৯টি শাখার ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালিত বিশেষ পরিদর্শনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। টাকা আত্মসাতের সঙ্গে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মির্জা আতিকুর রহমান এবং পরিচালক খালিদ হোসেন লিটু ও মির্জা সোহাগ মামুনসহ আরো কয়েকজনের জড়িত থাকার তথ্যও মিলেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ করা এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এসটিসি ব্যাংকের ওয়েবসাইট প্রস্তুতকারী, সহায়তাকারী ও সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া, সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ভুয়া মর্মে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ওয়েবসাইটটি অবিলম্বে বন্ধেরও সুপারিশ করা হয়েছে পরিদর্শকদলের ওই প্রতিবেদনে। এ ছাড়া চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগীদের প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের সুপারিশের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন গভর্নর ফজলে কবিরও। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের অনুরোধ করে শিগগিরই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির আমানত স্কিমের মুনাফার টোপ যেমন : এক বছর মেয়াদি হলে প্রতি লাখে মাসিক মুনাফা এক হাজার টাকা। দুই বছর মেয়াদি হলে প্রতি লাখে মাসিক মুনাফা এক হাজার ১০০ টাকা। আর তিন বছর মেয়াদি হলে প্রতি লাখে মাসিক মুনাফা এক হাজার ২০০ টাকা। আবার যেকোনো নির্ধারিত মেয়াদি জমা টাকায় এক বছরে বার্ষিক সুদ ১২ শতাংশ। দুই বছরে তা ১৩ শতাংশ এবং তিন বছরে সাড়ে ১৩ শতাংশ। পাঁচ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রাথমিক জমা টাকা ছয় বছরে হবে দ্বিগুণ এবং সাড়ে আট বছরে তিন গুণ। স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ (এসটিসি) ব্যাংক নামের এই প্রতিষ্ঠানটির আমানত স্কিমের মুনাফার চেহারা এ রকমই। দেশে বিনিয়োগের যতগুলো বৈধ উৎস রয়েছে, সেগুলোর চেয়ে এই স্কিমগুলোর মুনাফার হার অনেক বেশি। এ রকম উচ্চ মুনাফার লোভে ফেলে সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকা প্রতিষ্ঠানটি নীরবে বাগিয়ে নিচ্ছে। যা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে : এসটিসি ব্যাংক ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রথাগত ব্যাংক মর্মে তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়। তবে শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের কার্যক্রম চালানোর অনুকূলে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা কোনো সনদ পরিদর্শকদলকে দেখাতে পারেননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এসটিসি ব্যাংকের রাজধানীর মৌচাক শাখা ও তত্সংলগ্ন প্রধান কার্যালয়, খুলনার ফুলবাড়ী গেট শাখা, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ শাখা, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শাখা, কিশোরগঞ্জের হোসনপুর শাখা, নেত্রকোনার তেরী বাজার শাখা, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা শাখা, কুষ্টিয়ার মজমপুর শাখা এবং ঠাকুরগাঁও সদর শাখা পরিদর্শন করে দলটি। এর মধ্যে ছয়টি শাখায় এক কোটি ৭৩ লাখ টাকার আমানত সংগ্রহের তথ্য মিলেছে। তিনটি শাখা পরিদর্শনের সময় বন্ধ ছিল। প্রতিষ্ঠানটির নথিতে ৪৪টি শাখার তালিকা পাওয়া গেলেও এর বাইরে অনেক শাখা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী শাখার সংখ্যা ৩০০। ওয়েবসাইটের এই তথ্য সত্য হলে তাদের সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শাখাগুলোতে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ টাকা আমানতের বিপরীতে ঋণ বিতরণের হার প্রায় অর্ধেক। অবশিষ্ট সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ সাসপেন্স অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত হয়েছে। জড়িতদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য : এসটিসির পরিচালক মির্জা সোহাগ মামুন তাঁর নামে পূবালী ব্যাংকে হিসাব খোলেন। এ ছাড়া অন্য পরিচালক খালিদ হাসানের নামেও পূবালী ব্যাংকে হিসাব রয়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ওই হিসাবে এসটিসি ব্যাংকের শাখা থেকে আমানতকারীদের টাকা অবৈধভাবে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে ইস্টার্ন ব্যাংকের ফুলবাড়ী গেট শাখায় এসটিসি ব্যাংকের জিএম মো. আরাফাত নজিব এবং কর্মচারী সুবল কুমারের নামে খোলা যৌথ সঞ্চয়ী হিসাবে লেনদেন হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে এসটিসি ব্যাংকের পরিচালক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের টাকা মানি লন্ডারিং করে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে সুবিধাভোগী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সব ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করে দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার (বিএফআইইউ) মাধ্যমে পর্যালোচনা করে দেখার সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, এরই মধ্যে এসটিসি ব্যাংকের কিছু শাখা আমানতকারীদের টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। এ রকম একটি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শাখা। ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ওই শাখার কার্যক্রম শুরু হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা ভবন মালিককে না জানিয়েই একই বছরের ডিসেম্বরে গা-ঢাকা দেন। প্রতিষ্ঠানটি ১২ শতাংশ উচ্চ মুনাফার প্রলোভনে কয়েক মাসেই সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে লাখ লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। এ রকম ভুক্তভোগীদের একজন মো. ফারুক মিয়া। তিনি ওই শাখায় ২০১৯ সালের ২৯ এপ্রিল সাড়ে চার লাখ টাকা এফডিআর করেছিলেন। শাখার কর্মকর্তারা তাঁকে তিন মাস পর পর মুনাফার টাকা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি শ্রীমঙ্গল থেকে লাপাত্তা হওয়ার পর তিনি টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে সন্দিহান। এ ব্যাপারে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি অভিযোগও করেছেন তিনি। চাকরির ফাঁদে ফেলে টাকা লোপাট : মালিকপক্ষ থেকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আগ্রহী প্রার্থীদের কাছ থেকে জামানতের নামে এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়। বলা হয়, তাঁদের এই টাকা ব্যাংকে এফডিআর করে রাখা হবে। তাঁদের ব্যাংকের এফডিআরের মতো এসটিসি ব্যাংকের ছাপানো রসিদ সরবরাহ করা হয়। তাঁদের মধ্যে কাউকে কাউকে আবার নিয়োগও দেওয়া হয়। তাঁদের একজন হলেন আব্দুল মোমেন। তিনি প্রতিষ্ঠানটির শ্রীমঙ্গল শাখায় ২০১৯ সালের আগস্টে চাকরিতে যোগ দেন। চাকরির শর্ত হিসেবে শাখায় দুই লাখ টাকার একটি এফডিআর করলেও দুই-তিন মাস কাজ করে কোনো বেতন না পাওয়ায় তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। বর্তমানে তিনি এফডিআরের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির হোসেনপুর শাখার পাঁচ কর্মীকে নিয়োগ দেওয়ার সময় কথিত এফডিআর বাবদ আট লাখ ৯৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এই এফডিআরের বিপরীতে প্রতি মাসে লভ্যাংশ দেওয়ার আশ্বাস থাকলেও হোসেনপুর শাখার কর্মীরা আজও কোনো মুনাফা পাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শকদলের এক সদস্য বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অবৈধ ব্যাংকিং করার অভিযোগ ওঠার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টকে (এফআইসিএসডি) অনুরোধ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নরের অনুমোদন নিয়ে নমুনা ভিত্তিতে ব্যাংকটির ৯টি শাখার ওপর এই পরিদর্শন চালানো হয়।’

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles