মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১

নির্বাচন কমিশনের ঘটনা অভূতপূর্ব

গত মঙ্গলবার ভোটার দিবসে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার স্থানীয় নির্বাচন বিষয়ে যে বক্তব্য দেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা ওই বক্তব্য নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নির্বাচন কমিশনার এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পরস্পরবিরোধী এই বক্তব্যকে কেউ অভূতপূর্ব বলে আখ্যায়িত করছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশিষ্ট নাগরিকদের কেউ কেউ বলছেন, এ ধরনের আচরণের মাধ্যমে সিইসি নিজেই সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদাহানি করেছেন। কেউ আবার প্রশ্ন তুলেছেন, মাহবুব তালুকদার নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে কথা বললেও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে কেন কিছু বলেন না? কোনো রাজনৈতিক দলের আনুগত্যের কারণে নির্বাচনী অনিয়মের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। মাহবুব তালুকদার গত মঙ্গলবার স্থানীয় নির্বাচনকে অনিয়মের মডেল হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আর সিইসি কে এম নুরুল হুদা বলেন, ‘বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে হেয়, অপদস্থ ও নিচে নামানোর জন্য যা যা করা দরকার, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সবই করে চলেছেন।’ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অতীতেও নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতানৈক্যের ঘটনা ঘটেছে। তবে তা নিয়ে প্রকাশ্য মঞ্চে এ ধরনের ক্ষোভ প্রকাশের ঘটনা ঘটেনি। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার সফিউর রহমান ও এ কে এম মোহাম্মদ আলীর মতানৈক্য হয়। বিচারপতি এম এ আজিজের নির্বাচন কমিশনেও এম এম মুন্সেফ আলী ও এ কে এম মোহাম্মদ আলীর মতবিরোধ ঠেকাতে বিচারপতি মাহফুজুর রহমান, স ম জাকারিয়া, মাহমুদ হাসান মুনসুর—এঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু সে বিরোধিতাও প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত আক্রমণে রূপ নেয়নি।  গত মঙ্গলবারের ওই ঘটনা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনারদের দায়িত্ব হলো উনাদের ওপর সংবিধান অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা। কিন্তু একজন সদস্য সে দায়িত্ব পালন না করে নানা জায়গায় খবরদারি করছেন। এই অধিকার উনাকে কে দিয়েছে? কমিশনে থেকে যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে উনি যেসব কথাবার্তা বলছেন তা নজিরবিহীন। উনি কোনো রাজনীতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকতেই পারেন। কিন্তু যতক্ষণ সাংবিধানিক পদে আছেন ততক্ষণ উনার উচিত পদের মর্যাদা রক্ষা করে কাজ করা।’ অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) ন্যূনতম লজ্জাবোধ থাকলে তিনি কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সমালোচনা করতেন না, বরং যদি তাঁর মধ্যে ন্যূনতম বিবেকবোধ থাকত তাহলে নিজের অপকর্মের জন্য অনুশোচনা করতেন।’ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তাঁর বক্তব্যে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেননি। তিনি নির্বাচন সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে যা বলে আসছেন, গত মঙ্গলবার ভোটার দিবসের অনুষ্ঠানে তা-ই বলেছেন। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা যা বলেছেন তা কাম্য নয়। এভাবে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা উচিত হয়নি। এ ধরনের আচরণের মাধ্যমে সিইসি নিজেই সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদাহানি করেছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশনের  অনেক কিছুই অভূতপূর্ব।  একজন নির্বাচন কমিশনারকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ, মধ্যরাতে ভোট, আর্থিক দুর্নীতি—এসব কিছুই অভূতপূর্ব। এ নির্বাচন কমিশন তাদের বহু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দুর্নীতিমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দেশের করদাতাদের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছে।’ আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তো অন্য নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে মাহবুব তালুকদারের বিরুদ্ধেও। কিন্তু তিনি নির্বাচনে অনিয়ম নিয়ে কথা বললেও কমিশনারদের আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে  কিছু বলেন না। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন? এমন এক প্রশ্নে বদিউল আলম মজুমদার  বলেন, ‘বিষয়টি মাহবুব তালুকদারকেই জিজ্ঞাসা করেন।’ আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল বুধবার মাহবুব তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে  নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, প্রশিক্ষণে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তাঁকে কোন বিধির আওতায় টাকা দেওয়া হয়েছে তা জানতে চেয়ে কমিশনকে একটি ইউও নোট দিয়েছেন তিনি। ভোটার  দিবসে নির্বাচন কমিশনের ওই ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অবস্থা এখন বলার বাইরে চলে গেছে। নির্বাচন কমিশনাররাই মূল্যায়ন করে দেখুন, বাড়াবাড়িটা কার হয়েছে। মাহবুব তালুকদার বয়সে, অভিজ্ঞতায় সিইসি নরুল হুদার সিনিয়র। সিইসি এবং নির্বাচন কমিশনারদের পদমর্যাদা প্রায় সমান। মাহবুব তালুকদার যেটা বলেছেন তা যদি সঠিক হয়, তাহলে আমাদের নির্বাচনব্যবস্থার অবশ্যই সংস্কার  প্রয়োজন। এতে প্রকাশ্যে সিইসির ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা উচিত হয়নি।’ সিইসি ও মাহবুব তালুকদারের বিরোধে এর আগেও বেশ কিছু বিষয়ে মাহবুব তালকদার অন্য নির্বাচন কমিশনারদের বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং সিইসি কে এম নুরুল হুদার পাল্টা প্রতিক্রিয়ার শিকার হন। ২০১৭ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ৩৩ জন নির্বাচন কর্মকর্তার বদলি নিয়ে বিতর্ক বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের প্রতি প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা। ওই বছরের ১৬ জুলাই নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিষয়টি সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেছিলেন, ‘এসব মাহবুব তালুকদারের প্রডাক্ট। তিনি আমাদের উত্ত্যক্ত করছেন।’  স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ দিতে অন্য কমিশনাররা রাজি হলে মাহাবুব তালুকদার এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করেন তিনি। এসব বিরোধিতায় কয়েকবার কমিশন সভা বর্জন করে এবং নোট অব ডিসেন্ট দেয়। ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে কমিশনে আপিল শুনানিতে বিএনপির  চেয়ারপারসন দণ্ডপ্রাপ্ত  খালেদা জিয়ার আপিল মঞ্জুরের ঘোষণা দেন। ওই সময় তাঁর এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য চার কমিশনার। ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর মাহবুব তালুকদার সাংবাদিকদের প্রশ্নের লিখিত জবাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘আমি মনে করি না নির্বাচনে মোটেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলে কিছু আছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কথাটা এখন অর্থহীন কথায় পর্যবসিত হয়েছে।’ এর জবাবে ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাঙামাটিতে এক অনুষ্ঠানে সিইসি কে এম নুরুল হুদা মাহবুব তালুকদারের এ অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেন, ‘মাহবুব তালুকদার অসত্য কথা বলেছেন। নির্বাচনের সামগ্রিক পরিস্থিতি ভালো রয়েছে। সবাই নিজেদের মতো প্রচারণা চালাচ্ছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে অসুবিধা কোথায়?’ পরদিন ১৯ ডিসেম্বর মাহবুব তালুকদার এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, ‘এর আগে সিইসি আমার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নানারূপ বিরূপ উক্তি করেছেন। আমি কখনো তাঁর কথার প্রতিবাদ করিনি। কিন্তু ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’ বলে আমি মিথ্যা বলেছি, এ কথার প্রতিবাদ না করে পারলাম না।’

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles