মঙ্গলবার, অক্টোবর ১৯, ২০২১

পুলিশের নজরদারিতে ৩৫ জন হেফাজতের কেন্দ্রিয় নেতা

হেফাজতে ইসলামের বহুল আলোচিত নেতা মামুনুল হককে গতকাল দুপুরে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ নিয়ে গত এক সপ্তাহে হেফাজতের ৯ জন কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার হলেন। সংগঠনটির আরও ৩৫ জন নজরদারিতে আছেন, যাঁদের মধ্যে কেন্দ্রীয় ও শীর্ষস্থানীয় নেতা আছেন অন্তত ২৫ জন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার মামলায়ও অনেকে আসামি। ওই তিন দিনের সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭৭টি মামলা হয়েছে। তাতে আসামি ৪৯ হাজারের বেশি। গতকাল পর্যন্ত ৪৫০ জনের বেশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এর মধ্যে হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের বিরুদ্ধে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে অন্তত ১৮টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদের নেতৃত্বে তিনজনের একটি দল মাদ্রাসার ভেতর থেকে মামুনুল হককে বের করে নিয়ে আসে।

মাদ্রাসার একটি সূত্র জানায়, উপকমিশনার হারুন অর রশিদ প্রথমে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহফুজুল হকের কাছে যান। মাহফুজুল হক হলেন মামুনুল হকের বড় ভাই। পুলিশ কর্মকর্তারা অধ্যক্ষকে বলেন, মামুনুল হক তাঁদের সঙ্গে গেলে সম্মানের সঙ্গে থানায় পৌঁছে দেওয়া হবে। তাঁরা ফিরে গেলে অন্যরা আটক করলে সম্মান না–ও থাকতে পারে। এ সময় মামুনুল হক মাদ্রাসার ভেতরেই ছিলেন।এরপর মামুনুল পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেরিয়ে যান।

গ্রেপ্তারের পর মামুনুলকে প্রথমে শ্যামলীতে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনারের কার্যালয়ে নেওয়া হয়। বেলা ২টাই নেওয়া হয় তেজগাঁও থানায়। পরে তাঁকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, ২০২০ সালে মোহাম্মদপুরে একটি ভাঙচুরের মামলায় মামুনুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা আছে মতিঝিল থানা, পল্টন থানা ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে। পরে সেগুলো সমন্বয় করা হবে। আজ সোমবার মামুনুলকে আদালতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে।

মামুনুল হক হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিবের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর কমিটিরও সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব এবং জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা মোহাম্মদপুর এলাকায় মিছিল করেন। তবে কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।

উত্তেজক বক্তৃতার জন্য পরিচিত মামুনুল হক সম্প্রতি হেফাজতের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন। তবে ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে রয়্যাল রিসোর্টে দ্বিতীয় স্ত্রীসহ ঘেরাও হওয়ার পর মামুনুল হকের একাধিক বিয়ের খবর বের হয়। একের পর এক অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হন তিনি।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ৩ এপ্রিল সোনারগাঁয়ে রিসোর্টের ঘটনার পরদিন মোহাম্মদপুরের জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসায় খেলাফত মজলিসের নেতারা জরুরি বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে মামুনুল হক উপস্থিত ছিলেন।তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে লাইভ বক্তব্য ও স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন।

তেজগাঁও পুলিশ সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ৭ মার্চ মোহাম্মদপুর থানায় হওয়া মামলায় মামুনুল হক ৭ নম্বর আসামি। মোহাম্মদপুরের চান মিয়া হাউজিংয়ের বাসিন্দা জি এম আলমগীর শাহীন বাদী হয়ে মামলাটি করেছিলেন। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে বেআইনি জনতাবদ্ধে এলোপাতাড়ি মারধর, হত্যার উদ্দেশ্যে আঘাত করে গুরুতর জখম, চুরি, হুমকি দেওয়া, ধর্মীয় কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে গোলযোগ সৃষ্টি ও প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। একটি মুঠোফোন, সাত হাজার টাকা, ২০০ ডলার এবং ব্র্যাক ব্যাংকের ডেবিট কার্ড চুরি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে মামুনুল হকের নামে।

তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, মামলাটির তদন্ত তাঁরা করছিলেন। তদন্তে মামুনুল হকের সম্পৃক্ততা পাওয়ার পরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।ডিএমপি সদর দপ্তরের একটি সূত্র বলেছে, ডিবির মতিঝিল বিভাগে তদন্তাধীন আটটি মামলা, লালবাগ বিভাগে তদন্তাধীন দুটি মামলা এবং তেজগাঁও বিভাগে তদন্তাধীন একটি মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মামুনুল হক।এই ১৬ মামলার মধ্যে ১৫টি মামলাই হয়েছে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের তাণ্ডবের পর। এসব মামলার বাদী পুলিশ। ঢাকায় মামুনুল হকের বিরুদ্ধে সর্বশেষ মামলা হয় ৫ এপ্রিল। গত ২৬ মার্চ বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজের পর সংঘর্ষের ঘটনায় এ মামলা করেছেন ঢাকা মহানগর যুবলীগের (দক্ষিণ) উপদপ্তর সম্পাদক খন্দকার আরিফ উজ জামান। মামুনুল হক এ মামলার ১ নম্বর আসামি।

হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে গতকাল আদালতে হাজির করে পল্টন থানায় ২০১৩ সালের একটি মামলায় রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।
এদিকে গতকালই সাত দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীর। তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।হেফাজতের প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান ফয়েজী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মামুনুল হকসহ অন্যদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি তাঁরা আইনগতভাবে মোকাবিলা করবেন।

সশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, গত মাসে মোদিবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পর হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের গ্রেপ্তারের সম্ভাব্য একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সহিংসতার ঘটনায় হেফাজতের যেসব নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে যাঁরা এখনো সক্রিয় রয়েছেন, এমন ৩০ জনের একটি তালিকা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে দেওয়া হয়েছে। তালিকায় থাকা সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল ইসলামাবাদীকে ১১ এপ্রিল গ্রেপ্তার করে ঢাকার ডিবি পুলিশ। ১৪ এপ্রিল এ তালিকায় থাকা সংগঠনের সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক শাখাওয়াত হোসাইন রাজি, ১৭ এপ্রিল যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীব ও সহকারী মহাসচিব জালাল উদ্দিন আহাম্মদকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামুনুল হক এ তালিকায় ২ নম্বরে ছিলেন।

তালিকায় হেফাজতের আমির জুনায়েদ বাবুনগরীসহ ৩০ জনের নাম রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকি ২৫ জন নজরদারিতে আছেন। পর্যায়ক্রমে তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।
৩০ জনের তালিকায় নাম ছিল না এমন কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাও এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. মাহবুব আলম গত রাতে প্রথম আলোকে বলেছেন, হেফাজত নেতাদের বিরুদ্ধে এই গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত থাকবে। দলটির আরও ৩৫ নেতা তাঁদের ‘ওয়াচ লিস্ট’–এ রয়েছেন। পর্যায়ক্রমে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হবে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles