বুধবার, জানুয়ারি ২৬, ২০২২

বুয়েটছাত্র আবরার হত্যা মামলার রায় পেছাল আদালত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ রাব্বী (২২) হত্যা মামলার রায় ঘোষণার দিন পিছিয়ে ৮ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেছেন আদালত। ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান রোববার আবরার হত্যা মামলার রায় ঘোষণার নতুন দিন নির্ধারণ করেন। এর আগে কারাগারে থাকা ২২ আসামিকে বেলা পৌনে ১২টার দিকে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানা থেকে এজলাসে নেওয়া হয়।

এর আগে সকাল সোয়া ১০টায় কড়া পুলিশি পাহারায় কারাগার থেকে আসামিদের আদালতের হাজতখানায় হাজির করা হয়। আবরার ফাহাদ বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেন। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে।

এ ঘটনায় আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ ৭ অক্টোবর ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান ২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার বিচারকাজ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর জন্য ঢাকার মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আবেদন করেন মো. বরকত উল্লাহ। পরে ১২ মার্চ আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক আবরার হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ফাইল অনুমোদন করেন।

মামলার ২৫ আসামি

অভিযোগপত্রে যে ২৫ জনকে আসামি করা হয়, তারা হলেন-বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহতামিম ফুয়াদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মো. অনিক সরকার ওরফে অপু, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিন ওরফে শান্ত, আইন বিষয়ক উপসম্পাদক অমিত সাহা, উপ-সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল, ক্রীড়া সম্পাদক মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, গ্রন্থ ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক ইশতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, ছাত্রলীগকর্মী মুনতাসির আল জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, মো. মুজাহিদুর রহমান, মো. মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মো. মাজেদুর রহমান মাজেদ, শামীম বিল্লাহ, মুয়াজ ওরফে আবু হুরায়রা, এ এস এম নাজমুস সাদাত, আবরারের রুমমেট মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, এস এম মাহমুদ সেতু, মুহাম্মদ মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল ওরফে জিসান, এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম ও মুজতবা রাফিদ।

আসামিদের মধ্যে মুহাম্মদ মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল ওরফে জিসান, এহতেশামুল রাব্বি ওরফে তানিম ও মুজতবা রাফিদ পলাতক।

বাকি ২২ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে। এ মামলায় আসামিদের আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

যেভাবে হত্যা করা হয় আবরারকে

অভিযোগপত্রে আবরার হত্যার মূল হোতা এবং আবরারকে মারধরের ঘটনার সূচনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এজাহারভুক্ত আসামি মিজানুর রহমান ওরফে মিজানকে। তিনি আবরারের রুমমেট ছিলেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, আসামি মেহেদী হাসান রবিনকে জানান, আবরারকে তার শিবির বলে সন্দেহ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রবিন ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপ ‘এসবিএইচএসএল ১৫’ ও ‘এসবিএইচএসএল ১৬’-এর সবাইকে মেসেজ দেন এবং ২০১৯ সালের ৪ অক্টোবর রবিন ও মুন্নার নেতৃত্বে অমিত সাহা, সকাল, আকাশ, তাবাখখারুল, মনির, জিয়নসহ অন্য আসামিদের উপস্থিতিতে বৈঠক হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, আসামি মনিরের নেতৃত্বে তোহা, আকাশ, মাজেদ, মোর্শেদ, মুয়াজসহ অন্যরা গেস্ট রুমে আবরারকে পেটাবে।

অভিযোগপত্রে হত্যার পরিকল্পনা নিয়ে বলা হয়, ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর মুজতবা রাফিদ তার সহযোগী সকাল ও রবিনকে জানান, আবরার গ্রামের বাড়ি যাবেন। আবরারকে ধরলে আজই ধরতে হবে। এরপরই আসামিরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে রাত ৮টার পর শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুমে একত্র হন।

সেখান থেকে রবিন ও সকালের নির্দেশে তানিম, জেমি ও সাদাত ১০১১ নম্বর রুমে গিয়ে আবরারকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলেন, ২০১১ নম্বর রুমে বড় ভাইয়েরা তাকে ডেকেছে। পরে তারা আবরারকে তার ল্যাপটপ, দুটি মোবাইল ফোনসহ ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে যান।

আবরার হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় ১১ জন

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আবরারকে ২০১১ নম্বর রুমে নেওয়ার পরই তাবাখখারুল, সকাল ও রাফিদ তার মোবাইল ও ল্যাপটপ পরীক্ষা করতে থাকেন। তারা বলেন, আবরারের মোবাইলে ছাত্রশিবির সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। এটা শুনেই আবরারকে চশমা হাতে নিতে বলেন রবিন এবং আবরার তার চশমা হাতে নিলে রবিন তাকে চড় মারতে শুরু করেন। এর পরপরই মোর্শেদ ক্রিকেট স্ট্যাম্প নিয়ে এলে সকাল সেটা দিয়ে আবরারের পিঠ, পা, হাত ও নিতম্বসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্মমভাবে আঘাত করতে শুরু করে। এ সময় আসামি সকালের হাতের স্ট্যাম্পটি টুকরো হয়ে গেলে এহতেশামুল রাব্বি তানিম আরেকটি স্ট্যাম্প নিয়ে আসেন। আসামি অনিক সরকার সেটা দিয়ে আবরারের শরীরে একটানা আঘাত করতে থাকে। টানা মারধরে আবরার ফাহাদ রুমের মেঝেতে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুজাহিদুল ইসলাম ও শামীম বিল্লাহ স্কিপিং রোপ দিয়ে আবরার ফাহাদকে পিঠ ও পায়ে আঘাত করতে শুরু করে। আবরার তাকে মারধর না করার জন্য আকুতি-মিনতি জানালেও কেউ তা শোনেনি। মেফতাহুল ইসলাম জিয়নও স্ট্যাম্প দিয়ে আবরারকে মারতে থাকে এবং জিজ্ঞাসা করে, আবরার ছাত্রশিবির করেন কি না।

রাত ১১টার পর এস এম সেতু ২০১১ নম্বর রুমে এসে অন্যদের আবরার ফাহাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল ও মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, সে কোনো তথ্য দিচ্ছে না। তখন সেতু অন্যদের বলেন, ‘মারতে থাক।’ ওই নির্দেশের পর আবরারকে আবারও পেটানো শুরু করে আসামিরা। এর সঙ্গে আবরারের শরীরে কিল-ঘুষি, লাথি মারতে থাকে তারা। আসামি মেহেদি হাসান রবিন ও অনিক সরকার রুম থেকে বের হওয়ার সময় উপস্থিত অন্যদের বলে, ‘তোরা ওর কাছ থেকে তথ্য বের কর।’ আঘাতে প্রস্রাব ও বমি করে ফেলেন আবরার, অভিযোগপত্রে বলা হয়, রুমে পেটানোর সময় আসামিরা আবরারের মোবাইল পরীক্ষা করে ছাত্রশিবির সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে বলে আবারও স্ট্যাম্প দিয়ে তাকে আঘাত করে মনিরুজ্জামান মনির। উপস্থিত অন্য আসামিরাও আবরারকে প্রচণ্ড মারধর করতে থাকে। একপর্যায়ে আবরার ফাহাদ বমি ও প্রস্রাব করে ফেলেন। আবরার কথা বলতে না পারলেও ইশারায় তার প্রাণভিক্ষা চান এবং আর মারধর না করতে অনুরোধ করেন। পরে আসামিরা আবরারকে বাথরুমে নিয়ে পরিষ্কার করে পোশাক বদলে দেয়। এ সময় ইফতি মোশারফ সকাল ও মেহেদী হাসান রবিনের হুকুমে এ এস এম নাজমুস সাদাত, শামীম বিল্লাহ, আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরাইরা, জেমিসহ আরও কয়েকজন আবরারকে ধরাধরি করে ২০০৫ নম্বর রুমে নিয়ে যায় এবং জাহিদ হাসান জনিকে ডেকে মোশাররফ সকাল ২০১১ রুম পরিষ্কার করিয়ে নেয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, আবরার ফাহাদকে ২০০৫ নম্বর রুমে নেওয়ার পর আবারও জেরা করা শুরু হয় এবং জানতে চাওয়া হয়, বুয়েটে কে কে ছাত্রশিবির করে। কিন্তু আবরার তখন প্রায় সংজ্ঞাহীন। এ সময় রবিনকে আবু হুরাইরা, অমর্ত্য ইসলাম, মেহেদী হাসান বলেন, আবরারকে হাসপাতালে নিতে হবে। কিন্তু রবিন বলেন, ও নাটক করছে। শিবির চিনস না, শিবির চেনা কষ্ট। পরে আরও মারধরের পর ৬ অক্টোবর দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে মুয়াজ আবু হুরায়রা, ইফতি মোশারফ সকাল, মুজাহিদুল ইসলাম, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম তানভীর ও হোসেন মোহাম্মদ তোহা একটি তোষকে করে আবরারকে রুম থেকে বের করে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় ওঠার সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে রেখে দেন। এর মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আবরার। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আসামিরা আবরারকে হাসপাতালে পাঠানোর জন্য বুয়েটের চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন। চিকিৎসক এসে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করেন, আসামিরা যোগসাজশে একে অন্যের সহায়তায় ছাত্রশিবির সন্দেহে আবরারের বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে তাকে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। তাকে হত্যার পর খুনের আলামত ক্রিকেট স্ট্যাম্প, তোষক, বালিশ, ল্যাপটপ, মোবাইল ও স্টিলের পুরাতন চাপাতি শেরে বাংলা হলের ২০১১ নম্বর রুম থেকে এবং সিঁড়ির ল্যান্ডিং স্থান থেকে সরিয়ে নিয়ে একই হলের ২০১০ নম্বর রুমে রেখে দেন। ওই রুমে থাকতেন আরেক আসামি মুহতাসিন ফুয়াদ।

অভিযোগপত্রে আসামিদের পৃথক পৃথক অপরাধের বর্ণনা

অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা আসামি অনিক সরকার, ইফতি মোশাররফ সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মনিরুজ্জামান মনির, মুজাহিদুর রহমান, এ এস এম নাজমুস সাদাত, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম তানভীর, মুনতাসির আল জেমি, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, শামীম বিল্লাহ’র বিরুদ্ধে সরাসরি খুনে জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, আসামিরা একই উদ্দেশ্যে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে আবরারকে চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি, লাথি মেরে, কনুই দিয়ে পিঠে আঘাত করে, ক্রিকেট স্ট্যাম্প ও স্কিপিং রোপ দিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। এ ছাড়া এস এম মাহমুদ সেতু ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে একই উদ্দেশ্যে আবরারকে মারার জন্য হুকুম দেন। এ ছাড়া মেহেদী হাসান রাসেল, মিজানুর রহমান মিজান, মুহতাসিম ফুয়াদ, আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হোরায়রা, মোর্শেদ ওরফে মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মাজেদুর রহমান ওরফে মাজেদ, অমিত সাহা, ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে মুন্না, মুজতবা রাফিদ, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, শামছুল আরেফিন রাফাত এবং মুহাম্মদ মোর্শেদ-উজ-জামান ওরফে জিসান পূর্বপরিকল্পিতভাবে অপর আসামিদের সঙ্গে বিভিন্ন তারিখে মিটিং করে, ফেসবুকে মেসেজের মাধ্যমে কথা আদান-প্রদান করে, আবরারকে তার রুম থেকে ডেকে ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে নির্মমভাবে মারধর ও পিটিয়ে হত্যার কাজে সহায়তা করেন।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করেন, আসামি মিজানুর রহমান শিবিরের সঙ্গে আবরারের যুক্ত থাকার মিথ্যা তথ্য দেন। অপর আসামি মেহেদী হাসান রবিন শেরে বাংলা হল ছাত্রলীগের ফেসবুক গ্রুপে সেই তথ্য দিয়ে আবরারকে হত্যার সমর্থন আদায় করেন।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles