রবিবার, ডিসেম্বর ৫, ২০২১

মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ হওয়ার শঙ্কা

করোনা-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ঊর্ধ্বমুখী আন্তর্জাতিক পণ্য বাজার। সেই সুবাদে দেশের বাজারেও দফায় দফায় বাড়ছে ভোজ্য তেল, চিনি, আটা, ময়দাসহ প্রায় সব ভোগ্যপণ্যের দাম। একই সঙ্গে সবজির বাজারেও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। সর্বশেষ সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতি যেন অসহনীয় হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিং থেকে শুরু করে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সঠিক কৌশল গ্রহণ করা না হলে দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যস্ফীতির চাপ পড়বে অর্থনীতিতে। সরকারের পক্ষ থেকে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৫.৩ শতাংশে ধরে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রথম মাসেই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বুর্যোর দেওয়া তথ্য মতে, দেশে গত সেপ্টেম্বরে টানা তৃতীয় মাসের মতো মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৩৬ শতাংশ। আগস্টে বেড়ে হয় ৫.৫৪ শতাংশ এবং সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৫.৫৯ শতাংশ। অক্টোবর মাসের হিসাব এখন পর্যন্ত দিতে পারেনি বিবিএস।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, সামনের দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। তার অন্যতম কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। গত ৩ নভেম্বর সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ায়। এতে ভোক্তা পর্যায়ে এ দুই পণ্যের দাম ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশে ডলারের দাম ও বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধিসহ নানা কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। আর নতুন করে ডিজেলের দাম বাড়ানোয় সামনের দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। হতে পারে সামনের এক বছর তা বাড়তে পারে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না নির্ভর করবে সরকারের সঠিক কৌশল গ্রহণের ওপর।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়বে। কারণ কৃষকদের একটা বড় খরচ সেচকাজ। সেখানে ডিজেল ব্যবহার করে। ফলে উৎপাদিত এসব পণ্য যখন বাজারে আসবে তখনো মূল্যস্ফীতির চাপ থাকবে।’ তিনি সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণে মনিটরিংয়ের পাশাপাশি সঠিক কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দেন।

বিবিএসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী গত সেপ্টেম্বর মাসে খাদ্য নয় এমন পণ্যের মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৬.১৯ শতাংশ হয়েছে। আগস্টে এটি ৬.১৩ শতাংশ ছিল। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বরে বেড়ে হয় ৫.২১ শতাংশ, যেটি আগস্টে ছিল ৫.১৬ শতাংশ। তারা বলছে, চাল, ডিম, গম, রসুন, পেঁয়াজ, আদা ও হলুদের দাম সেপ্টেম্বর মাসে বেড়েছে। গতকাল সরেজমিন রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকার পণ্যবাহী পরিবহন শ্রমিক জাহিদ হোসেনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আগে আমরা সাভার থেকে মসুর ডাল আনতাম বস্তাপ্রতি ৩০ টাকা দরে, আজকে আনলাম ৩৩ টাকা দরে। ছয় টনি একটি ট্রাকে ৩০ থেকে ৪০ বস্তা মাল আনা হয়।’ ডিজেলের দাম বাড়ানোর পর থেকে প্রতিটি পণ্যের পরিবহন খরচ বেড়েছে। এর পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামনের দিনগুলোতেও দাম বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে জানান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকার কোনো কিছুর দাম বাড়ালে ব্যবসায়ীরা সেটিকে পুঁজি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। ফলে মূল্যস্ফীতি সামনের দিনগুলোতে আরো বাড়বে।’ তিনি আরো বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষিসহ সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে পড়তে পারে।’

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles