রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২১

২০০ বছরের ঐতিহ্য ব্রিটিশ আমল থেকে জনপ্রিয় ‘বেলা বিস্কুট’

মেজবানের মতো বেলা বিস্কুট চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মুখরোচক একটি খাবার। চট্টগ্রামবাসীর কাছে সকালে ঘুম থেকে উঠে চায়ে ডুবিয়ে কিংবা বিকেলের আড্ডায় বেলা বিস্কুটের কোনো বিকল্প নেই। মুখরোচক বেলা বিস্কুটের কথা কবি-সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদদের লেখায়ও উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাহিত্যিক আবুল ফজলের আত্মজীবনী ‘রেখাচিত্র’-এ বেলা বিস্কুট নিয়ে একটি লাইন রয়েছে। সেখানে লেখা হয়, ‘ঘুম থেকে উঠে পান্তা ভাতের বদলে খাচ্ছি গরম-গরম চা বেলা কি কুকিজ নামক বিস্কুট দিয়ে। কুকিজ ইংরেজি নাম বেলা কিন্তু খাস চাটগেঁয়ে।’ আজ থেকে কমপক্ষে ২০০ বছর আগে এই বিস্কুট উৎপাদন শুরু হয় চট্টগ্রামের বেকারিতে। মোগল, পর্তুগিজরা তখন খাবারের তালিকায় রাখত বেকারিজাতীয় পণ্য। সেই খাবারের প্রচলন থেকেই চট্টগ্রামের বেকারিতে তৈরি হয় বিশেষ ধরনের বিস্কুট ‘বেলা’। এরপর ধীরে ধীরে চট্টগ্রামের মানুষের মধ্যেই ধোঁয়া ওঠা গরম দুধ চায়ে বেলা বিস্কুট চুবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়। ব্রিটিশ আমল থেকে ক্রমেই এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের বেলা বিস্কুট দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি শুরু হয়। প্রবাসে চট্টগ্রামবাসী তো আছেনই, অন্য দেশের প্রবাসীরাও খাচ্ছেন মজাদার সেই বিস্কুট। বেলা বিস্কুট তৈরির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চট্টগ্রামের ‘গণি বেকারি’র নাম। ঠিক কখন গণি বেকারিতে বেলা বিস্কুট তৈরি হয় তার সঠিক তথ্য নেই। তবে মোগল আমলের শেষ দিকে ও ইংরেজ আমলের শুরুতে ভারতের বর্ধমান থেকে আসা ব্যক্তিরা এই বেকারিশিল্পের সূচনা করেন চট্টগ্রামে। আবদুল গণি সওদাগরের পূর্বপুরুষ লাল খাঁ সুবেদার ও তাঁর ছেলে কানু খাঁ মিস্ত্রির হাত ধরে বেকারি পণ্য তৈরির সূচনা হয় এই অঞ্চলে। গণি বেকারি নিয়ে গবেষণা করেছেন বাংলা একাডেমির সহপরিচালক আহমদ মমতাজ। তিনি বলেন, মোগল ও পর্তুগিজদের খাদ্যাভ্যাসে ছিল রুটি, পাউরুটি, বিস্কুটসহ বেকারি পণ্য। তাদের খাদ্যাভ্যাসের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেকারিশিল্পের যাত্রা শুরু হয় প্রায় ২৫০ বছর। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বেকারিশিল্পের প্রসার ঘটে চট্টগ্রামে। গণি বেকারি থেকে ব্রিটিশ সৈনিকদের জন্য বেকারি পণ্য তৈরি হতো। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত ১৭টি বেকারিতে তৈরি হতো বেলা বিস্কুট। এখনকার ক্রেতারাও বংশপরম্পরায় বেলা বিস্কুটের গ্রাহক। গণি বেকারির হাত ধরে বেলা বিস্কুটের প্রচলন শুরু হলেও ধীরে ধীরে ওয়েলফুডসহ দেশের প্রায় সব বড় ও অটোমেটেড মেশিনেও তৈরি হচ্ছে বেলা বিস্কুট। তবে গণি বেকারি এখনো সেই প্রাচীন পদ্ধতিতে বিস্কুট তৈরি করে ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে। চট্টগ্রামের চন্দনপুরায় কলেজ রোডে গণি বেকারিতে গিয়ে খোঁজ পাওয়া গেল লাল খাঁ সুবেদারের বংশধরের। তাঁর নাম আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশাম। ওয়াক্ফ দলিল অনুযায়ী বর্তমানে এই বেকারির কর্ণধার তিনি। তাঁর পূর্বপুরুষ আবদুল গণির নাম অনুসারে এই বেকারির নামকরণ হয়। গণি বেকারি মোড় হিসেবে পরিচিত এলাকাটি। আবদুল্লাহ মোহাম্মদ এহতেশাম জানান, গণি বেকারি শোরুমের পেছনেই বিস্কুট তৈরি হয়। পুরনো নিয়ম ধরে রাখায় এই বেকারিতে বেলা বিস্কুট তৈরিতে অন্তত দুই দিন সময় লাগে। প্রথমে ময়দা, চিনি, লবণ, ভোজ্য তেল, ডালডা, গুঁড়া দুধ পানিতে মিশিয়ে খামির তৈরি করা হয়। এই খামিরে ইস্টের পরিবর্তে বিশেষ ধরনের মাওয়া দেওয়া হয়। মাওয়ার উপাদান প্রকাশ করতে চান না তাঁরা। খামিরে মাওয়া মিশিয়ে এক দিন রাখার পর তন্দুরে প্রথম এক দফায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা ছেঁকা হয়। এরপর দ্বিতীয় দফায় আবারও ছেঁকে বেলা বিস্কুট তৈরি করা হয়। তন্দুরে গ্যাসের ব্যবহারের পাশাপাশি কয়লাও ব্যবহার হয়। গড়ে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ প্যাকেট বা আট থেকে দশ হাজার পিস বেলা বিস্কুট তৈরি হয়। বাণিজ্যের চেয়ে ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টাতেই এমন আয়োজন তাঁদের।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles