সোমবার, আগস্ট ২, ২০২১

হাঙ্গেরির মুসলমান

মধ্য ইউরোপের একটি স্থলবেষ্টিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র হাঙ্গেরি, যার বুকচিরে বয়ে গেছে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী দানিউব। হাঙ্গেরির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর হলো বুদাপেস্ট, যা দানিউব নদীর উভয় তীরে অবস্থিত। শহরটি পূর্ব-মধ্য ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। হাঙ্গেরি মোটামুটি সমৃদ্ধ দেশ। শিল্পসমূহের মধ্যে আছে লৌহ ও ইস্পাতশিল্প, সিমেন্ট কারখানা, সার কারখানা, চিনিশিল্প, রাসানিকশিল্প, চামড়াশিল্প প্রভৃতি। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। হাঙ্গেরিতে তেল ও গ্যাস ছাড়া অন্যান্য খনিজ দ্রব্যের মধ্যে আছে কয়লা, লিগনাইট, বক্সাইট প্রভৃতি। কৃষিপণ্যের মধ্যে তাদের আছে গম, রাই, বার্লি, ভুট্টা, আলু, সূর্যমুখী বীজ প্রভৃতি। দেশটির ৬৫ লাখ ১১ হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। হাঙ্গেরির জনগণ নিজেদের ‘মজর’ নামে ডাকে। ১৬০০ ও ১৭০০ শতকে দেশটির বেশির ভাগ ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের দখলে। ১৫২৬ সালে মোহাক্সের যুদ্ধের পর তুর্কিরা হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করেছিল। অটোমান শাসনের সময় হাঙ্গেরিতে অসংখ্য মুসলিম ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন উসমানীয় উজীরে আজম কানিজেলি সিয়াভু পাশা। এখানকার বেশির ভাগ মুসলিম ছিলেন হানাফি মাজহাবের অনুসারী। সে সময় এই অঞ্চলে বহু মুসলমান ছিল। এখন যে হাঙ্গেরিকে আমরা মুসলমানদের জন্য প্রতিকূল জায়গা হিসেবে চিনি, একসময় এই হাঙ্গেরিতে ছিল মুসলমানদের আবাসস্থল। এই অঞ্চল সম্পর্কে বিখ্যাত ঐতিহাসিক, ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল হামাভি আলেপ্পোয় পড়াশোনা করা এক বিখ্যাত হাঙ্গেরিয়ান শিক্ষার্থী সম্পর্কে লিখেছেন, সেই শিক্ষার্থীর মতে হাঙ্গেরিতে ৩০টি মুসলিম গ্রাম ছিল। ইয়াকুত তাঁর বিখ্যাত ভৌগোলিক অভিধান ‘মুজামুল-বুলদান’ লেখার সময় সেই যুবক থেকে হাঙ্গেরিয়ান মানুষের ইতিহাস এবং জীবনের কিছু বিবরণ নিয়ে এসেছিলেন। এখন আর হাঙ্গেরিতে মুসলমানদের সেই শক্ত অবস্থান নেই; বরং সে দেশে মুসলিম বিদ্বেষ চরমে। সে দেশের একটি গ্রাম আছে ‘এ্যাজোথঅলোম’। সেখানে মুসলিম পোশাক পরা, আজান দেওয়া নিষিদ্ধ। ইউরোপে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ করতে যেসব দেশ তৎপর, তাদের মধ্যে অন্যতম দেশ হাঙ্গেরি। ফলে সেখানে মুসলমানের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। ২০১১ সালের হাঙ্গেরিয়ান আদমশুমারি অনুসারে এখানে মুসলমানের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৫৭৯, যা সেখানকার মোট জনসংখ্যার ০.০৫৭ শতাংশ। বর্তমানে এদের মধ্যে চার হাজার ৯৭ জন বা ৭৩.৪ শতাংশ মানুষ নিজেদের জাতিগতভাবে হাঙ্গেরিয়ান বলে দাবি করে। তবে এই অঞ্চলের বেশির ভাগ মুসলমানই মূলত আরব ও তুর্কি বংশোদ্ভূত। তদুপরি এখানকার বহু জাতিগত হাঙ্গেরিয়ানরাও ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছে। অপরদিকে হাঙ্গেরিয়ানরা নিজেরাও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এরই মধ্যে তাদের দেশে জন্মহার কমে গেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে, প্রতিবছর হাঙ্গেরির জনসংখ্যা ৩২ হাজার করে কমছে এবং হাঙ্গেরির নারীদের সন্তানের সংখ্যা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর গড়ের তুলনায় কম। সে দেশের জন্ম হার মাত্র ১.৪৮%। ফলে জনসংখ্যা বাড়ানোর জন্য হাঙ্গেরির সরকারকে বিভিন্ন রকম পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। জনগণকে বাচ্চা নিতে আগ্রহী করতে দেশের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, দেশটিতে কোনো নারী চার সন্তান বা তার চেয়ে বেশি সন্তান জন্ম দিলে তাদের আয়কর মওকুফ করে দেওয়া হবে। বাচ্চা নেওয়ার শর্তে তরুণ দম্পতিদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়া হবে ইত্যাদি। এখন সে দেশে অভিবাসী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ফলে অনেক দেশ থেকেই মুসলমানরা সে দেশে প্রবেশ করছে। আশা করি, হাঙ্গেরি আবার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। সে দেশে আবারও মুসলমানরা নিশ্চিন্তে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles