শনিবার, জুন ১৯, ২০২১

ফেরার অপেক্ষা স্কুল আঙিনায়

রামিম হাসান। পড়ে রাজধানীর মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পঞ্চম শ্রেণিতে। করোনার কারণে বন্ধ থাকায় প্রায় এক বছর ধরে স্কুলমুখী হতে পারেনি। গত শনিবার টিভিতে স্কুল খোলার খবর শুনেই এখন সে খুশিতে আত্মহারা। দীর্ঘ বিরতির পর স্কুল আঙিনা মাড়াবে রামিম। এখনো এক মাস বাকি থাকলেও স্কুলে যাওয়ার জন্য নানা প্রস্তুতি এরই মধ্যে শুরু করে দিয়েছে মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুলের এই ছাত্র। রামিমের বাবা আবিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি রাতে অফিসে ঢোকার পরই সে আমাকে স্কুল খোলার খবর দেয়। এমনকি ওর মা ছেলের স্কুলড্রেস বের করে দেখে, তা ছোট হয়ে গেছে। এখন আবার নতুন ড্রেস বানাতে হবে। নতুন স্কুলব্যাগসহ নানা বায়না করছে আমার ছেলে। স্কুলে গিয়ে কী করবে, সে ব্যাপারেও চলছে নানা পরিকল্পনা। সব মিলিয়ে একটা খুশির আমেজ বিরাজ করছে।’ আগামী ৩০ মার্চ থেকে স্কুল-কলেজ খোলার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। তবে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে পূর্ণ ক্লাস হবে। নবম ও একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে দুই দিন এবং বাকিরা আপাতত সপ্তাহে এক দিন স্কুলে আসবে। তবে এখনই প্রাক-প্রাথমিক খুলছে না। জানা যায়, স্কুল খোলার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন বেশির ভাগ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। তবে প্রায় এক বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেকের মধ্যে কিছুটা ভয়ও কাজ করছে। কোনো কোনো অভিভাবক স্কুল খোলার পরও কিছুটা দেখেশুনে তাঁর সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীকেই যেহেতু সপ্তাহে এক দিন স্কুলে যেতে হবে, তাই অনেক অভিভাবকই সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর পক্ষে রয়েছেন। রাজধানীর কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্কুল-কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত আমরা আগে থেকেই চাচ্ছিলাম। তবে সরকার ধাপে ধাপে স্কুল খোলার যে পরিকল্পনা করেছে, তা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। তবে এখন শিক্ষকদের দায়িত্ব অনেক বেড়ে যাবে। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিশেষ পরিকল্পনা করতে হবে। যেহেতু অনেক শ্রেণির শিক্ষার্থীরাই সপ্তাহে এক দিন আসবে, তাই তাদের অনলাইন ক্লাসও চালাতে হবে। এতে শিক্ষকদের অনলাইন ও অফলাইন দুই মাধ্যমেই ক্লাস চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হবে। তবে যেসব স্কুলে শিক্ষক কম, তাদের বড় সমস্যায় পড়তে হবে।’ রাজধানীর ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘স্কুল-কলেজ খোলার সরকারি সিদ্ধান্তে সবার মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। আমরা যদিও আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছি, তবে এখন আবার নতুন করে পরিকল্পনা শুরু করেছি। যেহেতু শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে বসাতে হবে, তাই এক ক্লাসের শিক্ষার্থীদের হয়তো দুই ভাগ করে বসাতে হবে। আলাদাভাবে রুটিন প্রকাশ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের ক্ষতি কিভাবে পোষানো যায়, তা নিয়েও আমরা পরিকল্পনা করছি।’ জানা যায়, দেশে প্রায় ৩০ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগ দেয় বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। কিন্তু মামলা জটিলতায় প্রায় দুই বছর শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় প্রায় ৭৭ হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। কিন্তু স্কুল-কলেজ খোলার পর এক শ্রেণিকে একাধিক ভাগে ক্লাস নিতে হলে শিক্ষকের অভাবে ভুগবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। এদিকে ৩০ মার্চ থেকে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি না খোলায় খুব একটা খুশি নয় কিন্ডারগার্টেন কর্তৃপক্ষ। কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান ইকবাল বাহার চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি বিপদে আছি আমরা। আর আমাদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাই জমজমাট থাকে। প্লে, নার্সারি ও কেজি শ্রেণিতেই আমাদের শিক্ষার্থী বেশি থাকে। সেটা না খুললে আমরা শিক্ষার্থী পাব কোথায়? এ ছাড়া এ বছর তেমন একটা শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। এপ্রিল থেকে রোজা শুরু। ফলে অনেকেই গ্রামের বাড়ি থেকে আসবে না বা গ্রামে চলে যাবে। ফলে স্কুল খুললেও আমাদের শিক্ষার্থী পাওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলে এ বছর আমাদের স্কুল টিকিয়ে রাখাই কষ্টকর হয়ে যাবে।’ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) মো. বেলাল হোসাইন বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও সব শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন স্কুলে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তাই অনলাইন শিক্ষা অব্যাহত রাখতে হবে। অনেক স্কুলই এরই মধ্যে অনলাইন ক্লাস শুরু করেছে, যা স্কুল খুললেও অব্যাহত থাকবে। শুধু এ বছরই নয়, আগামী দিনেও আমরা অনলাইন শিক্ষার ওপর জোর দেব, যাতে ভবিষ্যতে ফের কোনো সমস্যায় পড়লে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কোনো ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে।’

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles