রবিবার, জুলাই ২৫, ২০২১

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে এক বছর পিছিয়ে

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে ২০১৪-১৫ সেশনে ঢাকা কলেজে বাংলায় স্নাতকে (সম্মান) ভর্তি হন এ কে এম আবু বকর। হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালে অনার্সের ফল প্রকাশের পর ২০১৯ সালে মাস্টার্সের ফল শেষে তাঁর পড়ালেখা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি সবেমাত্র মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর আগে আরো দুটি সেশনের শিক্ষার্থীরা মাস্টার্সে পড়ছেন। তাঁদের পরীক্ষা শেষে তাঁর সেশনের পরীক্ষা হবে। এরপর আবার ফল প্রকাশের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হবে। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে তাঁর সেশনের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা শেষ করে ফল প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছেন।

আবু বকর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর আমরা এগিয়ে যাব, পড়ালেখার মান বাড়বে—এটাই আশা ছিল। কিন্তু এখন দেখছি সম্পূর্ণই উল্টো। আমার সঙ্গে যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত তার পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে, আর আমি সবেমাত্র মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছি। আমার জীবন থেকে কমপক্ষে দেড় বছর হারিয়ে গেছে। চাকরিজীবনেও আমি পেছনে পড়ে যাব। এর দায় কে নেবে?’ জানা গেছে, শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য রাজধানীর সাত কলেজকে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত করা হয়। কিন্তু শিক্ষার মান উন্নয়ন তো দূরের কথা, বরং সেশনজট, বিলম্বে ফল প্রকাশসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন দুই লাখ শিক্ষার্থী। সমস্যা সমাধানে মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হলেও জটিলতার নিরসন হচ্ছে না। এমনকি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও এক বছর পিছিয়ে আছেন। করোনায় সেশনজট আরো বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও সাত কলেজের সমন্বয়ক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব শিক্ষার্থী নিয়েছি, তাদের আগের কারিকুলামে পড়াতে গিয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। মূলত প্রথম দিকে আমরা প্রস্তুত না থাকার কারণে কিছুটা পিছিয়ে ছিলাম। কিন্তু যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হিসেবে ভর্তি হয়েছে তারা কোনোভাবেই পিছিয়ে নেই। বর্তমানে আমরা চলমান ও সাম্প্রতিক ঘোষিত পরীক্ষাগুলো নিচ্ছি।’ স্নাতকের (সম্মান) ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা যাঁরা ঢাবি অধিভুক্ত কলেজে পড়ছেন তাঁদের তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছে, আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চতুর্থ বর্ষে পড়ছেন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন তৃতীয় বর্ষে (নিউ), আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষার অপেক্ষায়। একইভাবে ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ঢাবিতে দ্বিতীয় বর্ষে (নিউ), আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছেন। স্নাতকোত্তরে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ঢাবি অধিভুক্ত কলেজ থেকে মৌখিক পরীক্ষা দিচ্ছেন, অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ২০১৯ সালে পরীক্ষা দিয়েছেন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা সবেমাত্র ফরম পূরণ করেছেন, আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা চলছে। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে শিক্ষার্থীরা মাত্র দুই মাস আগে ভর্তি হয়েছেন, আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করছেন। জানা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে যাঁরা স্নাতকে (সম্মান) ভর্তি হয়েছিলেন, তাঁরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছেন। তবে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছেন। তাঁরা এক বছরের সেশনজটে রয়েছেন। সেশনজটের কারণে প্রতিটি বর্ষেই দুটি ব্যাচকে পড়ালেখা করতে হচ্ছে। সে জন্য প্রতিটি ব্যাচে ‘ওল্ড’ ও ‘নিউ’ নামে দুটি ব্যাচ রয়েছে। রাজধানীর সাত কলেজে আগে থেকেই কয়েক গুণ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন। কিন্তু ক্লাসরুম বা শিক্ষকের সংখ্যা বাড়েনি। এতে একই শিক্ষককে দুই ব্যাচ পড়াতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমনকি একই ক্লাসরুম দুটি ব্যাচের জন্য বরাদ্দ হওয়ায় তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সরকারি তিতুমীর কলেজে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র ২০০ জন শিক্ষক রয়েছেন। এতে শিক্ষকরা মানসম্পন্ন পড়ালেখা করাতে পারছেন না। জানা গেছে, মূলত পরিকল্পনার ভুলের মাসুল দিচ্ছেন ঢাবি অধিভুক্ত সাত কলেজের দুই লাখ শিক্ষার্থী। প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে রাজধানীর সাত কলেজকে ঢাবির অধিভুক্তির নির্দেশনা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সুদূরপ্রসারী এই চিন্তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু যাঁরা এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছেন, তাঁদের কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। মূলত দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ভিসির দ্বন্দ্বের কারণেই তড়িঘড়ি করে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই সাত কলেজকে ঢাবির অধিভুক্ত করা হয়, যাতে বিপদে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেসব শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে ঢাকার সাত কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন, তাঁদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই পড়ালেখা শেষ করানো উচিত ছিল। আর নতুন শিক্ষার্থীদের ঢাবি অধিভুক্ত কলেজ হিসেবে ভর্তি করানো যেত। এতে হয়তো সাত কলেজকে পুরোপুরি ঢাবির অধিভুক্ত করতে আরো তিন-চার বছর সময় বেশি লাগত, কিন্তু এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পৃথকভাবে কলেজ পরিদর্শকের কার্যালয়, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়সহ প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নিতে পারত। কারিকুলামও নতুনভাবে প্রণয়নের কাজ এই সময়ে সহজেই করা যেত। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার, আর রাজধানীর সাত কলেজের শিক্ষার্থী প্রায় দুই লাখ। ফলে হঠাৎ করেই নিজেদের চার গুণ শিক্ষার্থী অধিভুক্ত করে হিমশিম অবস্থায় পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এতেই মূলত সাত কলেজে সেশনজট বেড়েছে। সম্প্রতি আগামী ২৪ মে থেকে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার ঘোষণা দেয় সরকার। এর আগ পর্যন্ত সব পরীক্ষা বন্ধেরও ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শুধু তাঁদের পরীক্ষা গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়। মূলত সবার চেয়ে পিছিয়ে আছেন বলেই তাঁদের এই সুযোগ দেওয়া হয়। সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে তাঁদের আন্দোলনে ৯ দফা দাবি জানান। সেগুলো হলো অধিভুক্তি বাতিল নয়, সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করা; সাত কলেজের সমস্যা সমাধানে একটি স্থায়ী পদ্ধতি অনুসরণ; সাত কলেজের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা একটি একাডেমিক ভবন তৈরি; প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র যাচাই ও ফল প্রকাশ সাত কলেজের শিক্ষক দ্বারা পরিচালনা করা; পরীক্ষার ৯০ দিনের মধ্যেই ফল প্রকাশ; প্রতিটি সেশনে এক বছরের বেশি কালক্ষেপণ না করা; শিক্ষকদের প্রতিটি ক্লাস গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া; নির্ভুলভাবে প্রতিটি সেশনের ফল প্রকাশ করা এবং সাত কলেজের জন্য পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, পরিবহন ও আবাসনের ব্যবস্থা করা। সরকারি তিতুমীর কলেজের ২০১৮-১৯ সেশনের ইংরেজিতে স্নাতক (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত মো. তাসলিম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার সঙ্গে যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভর্তি হয়েছে তারা এক বছর এগিয়ে আছে। আমাদের সমস্যার শেষ নেই। যথাসময়ে পরীক্ষা হচ্ছে না, ফল প্রকাশে ১১ মাস পর্যন্ত সময় লাগছে। আবার দেখা যাচ্ছে, গণহারে শিক্ষার্থীরা ফেল করছে। আমাদের দিয়ে মূলত এক্সপেরিমেন্ট করানো হচ্ছে। আমরা কলেজে আমাদের সমস্যার কথা বললে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাও, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে বলা হয়, কলেজে যাও। এভাবেই আমরা দৌড়াদৌড়ি করছি।’ ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাত কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার সময়টায়ই মূল সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। করোনা না হলে আমরা এত দিনে এই সমস্যা ওভারকাম করতে পারতাম। আশা করছি, আগামী এক বছরের মধ্যে সাত কলেজে সেশনজট থাকবে না। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাত কলেজের কার্যক্রম দেখভালের জন্য কিছু লোক নিয়োগ দিয়েছে, তবে এখনো আরো বেশ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সেগুলো হলে সাত কলেজের কার্যক্রমে আরো গতি আসবে।’

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles