শনিবার, জুলাই ২৪, ২০২১

করোনা জয়ের কাছাকাছি দেশ

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ার এক বছর পূর্ণ হতে যাচ্ছে আগামীকাল সোমবার। গত বছরের ৮ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম জানানো হয় তিনজনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন বিদেশফেরত এবং একজন দেশে থাকা তাদের পরিবারের সদস্য। তাদের কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এর ১০ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় মৃত্যু ঘটে রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগে। এর পর থেকেই প্রতিদিন বাড়তে থাকে শনাক্ত ও মৃত্যু। দেশে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ছিল গত বছরের জুন মাসে। সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল জুলাই মাসে। করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে দেশেও নেওয়া হয় নানা ধরনের কার্যক্রম। এপ্রিলের শেষ ভাগ থেকে জুলাইয়ের প্রথম ভাগ পর্যন্ত লকডাউনের আদলে সাধারণ ছুটি থাকায় মানুষের চলাচল, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত সব ক্ষেত্রেই অচলাবস্থা চলে। এলাকায় এলাকায় করোনায় আক্রান্ত মানুষের বাড়িঘরে উড়ানো হয় লাল পতাকা। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে সব মানুষ। করোনায় আক্রান্ত মৃতদের লাশ থেকে দূরে থাকে আপনজনরাও। মরদেহ ফেলে স্বজনদের পালিয়ে যাওয়া, মরদেহ দাফন বা সৎকারের জন্য লোক না পাওয়া, হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সেবায় চিকিৎসক-নার্স না পাওয়ার মতো কিছু কিছু অমানবিক ঘটনাও ঘটে। সঙ্গে ছিল হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি। কেনাকাটায় দুর্নীতির বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে বারবার। স্বাস্থ্যসচিবসহ কিছুসংখ্যক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। পরিস্থিতির মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক। ভুয়া হাসপাতাল, করোনা টেস্টের নামে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সাহেদ, জেকেজির ডা. সাবরিনা ও তাঁর স্বামী আরিফুর রহমানসহ নকল মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ এবং আরো বেশ কিছু করোনাকেন্দ্রিক অপরাধে জড়িত থাকায় অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়। তবে সব কিছু ছাপিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্ব এবং নির্দেশনায় অন্য দেশের তুলনায় দ্রুত সময়ের মধ্যেই দেশ আবার স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরে আসতে শুরু করে। ভয়কে জয় করে সাহস নিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় মানুষ। এক পর্যায়ে গত ২০ জানুয়ারি দেশে আসে করোনাভাইরাসের টিকা। ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ওই টিকা দেশের মানুষের শরীরে প্রয়োগ করার উদ্বোধন করেন। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারকে এরই মধ্যে সাফল্যের কৃতিত্ব দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছে জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আরো একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা। তবে দেশ থেকে এখনো করোনা বিদায় নেয়নি, বরং অনেক মানুষের অসতর্ক আচরণের কারণে চোখ রাঙাচ্ছে। গত মাসেও করোনায় শনাক্ত বা সংক্রমণ নিচের দিকে নেমে ছিল, এখন আবার তা বাড়তে শুরু করেছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা সবার প্রতি বারবার স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান জানাচ্ছেন। বলা হচ্ছে, সতর্কতায় শিথিলতা দেখালে যেকোনো সময় পরিস্থিতি আরো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যেতে পারে। এ আশঙ্কা ছাড়া করোনার এক বছরের মাথায় এসে পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার এবং অতিবাহিত চ্যালেঞ্জের বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. রুহুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, এ ধরনের একটি বৈশ্বিক মহামারির কারণে শুরুর দিকে দেশ যে  চ্যালেঞ্জ ও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী হস্তক্ষেপ, নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় দ্রুত সময়ের মধ্যেই তা কাটিয়ে আবার সাফল্যের পথে উঠে আসা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘আমরা এখন আগের তুলনায় ভালো অবস্থায় থাকলেও কিংবা টিকা নিলেও সবাইকেই মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।’ আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত করোনা নির্মূল না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ঝুঁকির মধ্যেই থাকব। ফলে সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য-উপাত্ত অনুসারে দেখা যায়, গত বছরের ৮ মার্চ থেকে শুরু করে গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে মোট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে পাঁচ লাখ ৪৯ হাজার ৭২৪ জন। এর মধ্যে মারা গেছে আট হাজার ৪৫১ জন এবং সুস্থ হয়েছে পাঁচ লাখ এক হাজার ৯৬৬ জন। এখন পজিটিভ রোগী আছে ৩৯ হাজার ৩০৭ জন। মৃতদের মধ্যে ৭৫.৫৯ শতাংশ পুরুষ এবং ২৪.৪১ শতাংশ নারী। সর্বোচ্চ ৮০.৪২ শতাংশই ছিল ৫০ বছরের বেশি বয়সের মানুষ। তাদের বেশির ভাগই আগে থেকে নানা ঝুঁকিপূর্ণ রোগে আক্রান্ত ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে এখনো প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছে ১০ জন, নতুন শনাক্ত হয়েছে ৫৪০ জন এবং সুস্থ হয়েছে ৮২২ জন। এর মধ্যে সর্বশেষ গড় অনুসারে দৈনিক শনাক্তের হার ৪.১৩ শতাংশ, মোট শনাক্তের হার ১৩.৩০ শতাংশ। সুস্থতার হার ৯১.৩১ শতাংশ, মৃত্যুহার ১.৫৪ শতাংশ। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান জানান, গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত টিকা দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন ৪৯ লাখ দুই হাজার ৯৪৮ জন। গতকাল দুপুর পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ১৫২ জন। টিকা নেওয়ার পর মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ৮২৫ জনের মধ্যে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles