শনিবার, জুলাই ২৪, ২০২১

জলাবদ্ধতায় খাতুনগঞ্জের ক্ষতি ২৫০০ কোটি টাকা

অতিবৃষ্টি বা জোয়ারের পানিতে বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে জলাবদ্ধতার চিত্র পুরোনো। এবার গবেষণায় ওঠে এসেছে, দেশের বড় পাইকারি এ বাণিজ্য কেন্দ্রে এক দশকে জলাবদ্ধতার কারণে চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, আছদগঞ্জ ও কোরবানীগঞ্জে ২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সরাসরি এই ক্ষতি হয়েছে পাঁচ হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। চট্টগ্রাম চেম্বারের সহযোগিতায় সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণা করা হয়। গতকাল সোমবার আগ্রাবাদে চট্টগ্রাম চেম্বারের বঙ্গবন্ধু হলে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম গবেষণাটি তুলে দেন সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর হাতে। গবেষণায় বলা হয়, আর্থিক ক্ষতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে পাঁচ ধরনের হিসাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো জলাবদ্ধতার সময় পণ্যের ক্ষতির পরিমাণ, অবকাঠামো ও সম্পদের ক্ষতি, অবকাঠামো খাতে বাড়তি বিনিয়োগ, পরিবহনসেবা ও শ্রম খাতে কর্মঘণ্টা নষ্ট এবং বাড়তি পরিচালন ব্যয়। সরাসরি ছাড়াও পরোক্ষ ক্ষতির কথাও তুলে ধরা হয় গবেষণায়। অবশ্য পরোক্ষ ক্ষতির আর্থিক মূল্য বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। জলাবদ্ধতা নিরসনে গবেষকেরা ১৭ দফা সুপারিশ করেন। তার মধ্যে রয়েছে চাক্তাই খাল খনন, বহুমুখী পণ্য পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা, জলাধার ও সবুজ এলাকা বাড়ানো ইত্যাদি। গবেষণাটি করেছেন ঢাকা স্কুল অব ইকনোমিকসের পরিবেশ অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এ কে এম নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক রিয়াজ আকতার মল্লিক ও আরবান মেট্রোলজিস্ট আবু তৈয়ব মোহাম্মদ শাহজাহান। গবেষণার সমন্বয়কারী ছিলেন সুমাইয়া মামুন। গবেষণা দলের নেতৃত্ব দেন বেসরকারি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আবু তৈয়ব মো.শাহজাহান। শত বছরের বেশি পুরোনো এই বাণিজ্যকেন্দ্রে দেশে ভোগ্যপণ্যের বড় অংশই বেচাকেনা হয়। আর্থিক ক্ষতি উঠে এলেও বছরে এখানে কত বেচাকেনা হয়, তার তথ্য নেই গবেষণায়। তবে ব্যবসায়ীদের হিসাবে, দিনে ৫০০ কোটি টাকা ধরা হলে বছরে লেনদেন দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। একই পণ্য একাধিকবার হাতবদল হয়ে লেনদেনও বেড়ে যায়। গতকালের অনুষ্ঠানে গবেষক এ কে এম নজরুল ইসলাম বলেন, জলাবদ্ধতার প্রভাবে প্রতিবছর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। শতভাগ প্রতিষ্ঠানই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দোকান বা গুদামে পানি ঢুকে পণ্য নষ্ট হচ্ছে। আবার কম দামেও পণ্য বিক্রি করতে হয়। ব্যবসায়ীদের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতির বিষয়টিও এখানে রয়েছে। এখান থেকে সারা দেশে পণ্য যায়। তাতে এর প্রভাব কার্যত সারা দেশে পণ্যের দামেও পড়ছে। গবেষক রিয়াজ আকতার মল্লিক বলেন, দিনে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলেই চাক্তাই খালসহ আশপাশের খালে পানির উচ্চতা ৪ দশমিক ১ মিটার বেড়ে যায়। এতে প্রধান সড়কে ১ মিটারের উঁচু পানি জমে যায়। জোয়ার হলে তা আরও বাড়ে। ‘ইউ ম্যাপ’ মডেল ব্যবহার করে খাতুনগঞ্জ এলাকায় জলাবদ্ধতা কমানোর পদ্ধতি দেখান আরবান মেট্রোলজিস্ট আবু তৈয়ব মোহাম্মদ শাহজাহান। তিনি বলেন, খাতুনগঞ্জে বর্তমানে ৫৫ দশমিক ৯০ শতাংশ এলাকাজুড়ে ভবন রয়েছে। খাল, নালাসহ জলাধার রয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৮০ শতাংশে। অথচ এই এলাকায় জলাধার বাড়ানো গেলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যাবে। অনুষ্ঠানে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘খাতুনগঞ্জের এই আর্থিক ক্ষতির জন্য দায়ী আমরাই। চাক্তাই খাল দখল করে ও পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করেছেন ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালীরা। এখন সবাই মিলে দখলদারদের উচ্ছেদ করার সময়।’ চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ১৯৯১ সালে ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে জোয়ারের পানি বেড়ে ও অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। অনেকের গুদাম পরিত্যক্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাই খাতুনগঞ্জ থেকে ব্যবসার ৫০ শতাংশ এখন অন্যত্র চলে গেছে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রধান খন্দকার আহসান হোসেন, ন্যাশনাল রিজিয়েলেন্স প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক নুরুন নাহার, ইউএনডিপির প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট আরিফ আবদুল্লাহ খান। এতে চেম্বারের পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর, খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমেদ বক্তব্য দেন।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles