বুধবার, জুলাই ২৮, ২০২১

কোথাও উপচে পড়া রোগী কোথাও খালি

পরিপাটি ও দৃষ্টিনন্দন কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই দেখা যায় কিছুটা ধীরগতিতে বেরিয়ে যাচ্ছিল একটি অ্যাম্বুল্যান্স। ভেতরে রোগী ও স্বজনদের উপস্থিতি চোখে পড়লে ইশারা দিতেই থেমে দাঁড়ান চালক। জানতে চাইলে রোগীর স্বজনদের একজন কফিল হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বড় ভাইরে আনছিলাম ভর্তি করবার জন্য। তার করোনা হইছে। কিন্তু এইহানতে নাকি বেড খালি নাই। অহন ঢাকা মেডিক্যালে নিতাছি।’ এই অ্যাম্বুল্যান্স চলে যাওয়ার পরপরই একটি অটোরিকশায় উঠতে দেখা যায় আরো তিন-চারজনকে। এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলে একজন বলেন, ‘এখানে তো বেড খালি নাই। এখন মহাখালীর একটা হাসপাতালে যাইতাছি।’ গত সপ্তাহে করোনায় আক্রান্ত একজন ষাটোর্ধ্ব বয়সের রোগীর সন্তান আবরার হোসেন অসহায়ত্ব প্রকাশ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাবার প্রথমে হালকা জ্বর হয়, সঙ্গে কিছুটা কাশিও হয়। সন্দেহবশত করোনা টেস্ট করাই, তাতে রেজাল্ট পজিটিভ আসে, আগে থেকে তাঁর ডায়াবেটিসও আছে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে তাঁকে প্রথমেই নিয়ে যাই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনি বেড খালি নেই; তখন মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে! তারা পরামর্শ দেয় ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়ার। যানজট ঠেলে রওনা দিই ঢাকা মেডিক্যালে, পথে বাবার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়ে। ফোনে একজন পরিচিত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি দ্রুত কোনো আইসিইউ সাপোর্টে নেওয়ার পরামর্শ দেন। আতঙ্কিত হয়ে ফোনেই ঢাকা মেডিক্যাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যোগাযোগ করি—কোথাও আইসিইউ খালি নেই।’ আবরার হোসেন বলেন, ‘নিরুপায় হয়ে ধানমণ্ডির একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানেই চিকিৎসা চলে। এখন বাবা কিছুটা সুস্থ হলেও বিল পরিশোধ করতে বড় বিপদের মুখে পড়েছি। এত বিল আসবে কল্পনাও করতে পারিনি আর সামর্থ্যও নেই। প্রাইভেট এই হাসপাতালে সাধারণ বেডেও করোনা রোগীদের অনেক খরচ যায়। সরকারি হাসপাতালে যদি বেড খালি পাওয়া যেত, তবে আমাদের এই অবস্থায় পড়তে হতো না।’ কেবল এই একজনই নয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেরই সাবেক এক কর্মকর্তা নিজেও আইসিইউ পাননি তাঁর পছন্দের সরকারি হাসপাতালে। বাধ্য হয়ে স্বজনরা তাঁকে একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেছে। করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাপে কোনো কোনো হাসপাতালে প্রথমবারের মতোই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আবার হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং ভালো চিকিৎসার সুনাম থেকে হাতে গোনা দু-একটি হাসপাতালের প্রতি মানুষের আস্থা ও আগ্রহও বেশি তৈরি হয়েছে। ফলে এই হাসপাতালগুলোই এখন করোনায় আক্রান্ত রোগীদের প্রথম পছন্দ থাকে। ফলে ভিড়ও সেখানেই হয় বেশি। পাশাপাশি অন্য হাসপাতালে বেড খালি থাকলেও সেদিকে নজর পড়ে কম। সাধারণ বেডের ক্ষেত্রে দু-একটি হাসপাতালে সমস্যা প্রকট হলেও আইসিইউ বেডের জন্য রীতিমতো সব হাসপাতালেই যেন হাহাকার অবস্থা তৈরি হয়েছে আবার। কারণ অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত যেকোনো বয়সের রোগী কিংবা বয়স্করা করোনায় আক্রান্ত হলেই তাঁদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ফলে তাঁদের মধ্যে একটা অংশের জন্য আইসিইউ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেডের তুলনায় দেড় শ জন অতিরিক্ত রোগী রেখেছি। তা-ও কুলাতে পারছি না। অনেককেই নিরুপায় হয়ে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। কারণ প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও নার্স পাচ্ছি না। বিষয়টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে জানিয়েছি। জনবল না পেলে আমরা কিভাবে রোগীদের সেবা দেব। রোগী রাখলেই তো হবে না। তাদের প্রয়োজনীয় সেবাটুকু দিতে হবে।’  একই চিত্র জানা যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। গতকাল মঙ্গলবার অধিদপ্তর থেকে পাঠানো তথ্য অনুসারে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ২৭৫ বেডের করোনা ইউনিটে রোগী আছে ৩৯৩ জন। অর্থাৎ ১১৮ জন অতিরিক্ত রোগী আছে এই হাসপাতালে। ১০টি আইসিইউ বেডের সব কটিই পরিপূর্ণ। তবে অন্য সব হাসপাতালে সাধারণ বেড খালি আছে বিভিন্ন সংখ্যায়, যদিও আইসিইউ বেডের বেশির ভাগই রোগীতে ভরা। ওই তথ্য অনুসারে দেখা যায়, ঢাকার প্রধান ১০টি সরকারি করোনা হাসপাতালের মোট দুই হাজার ৩৮১টি বেডের এক হাজার ৭৪৫টিতে রোগী রয়েছে। খালি আছে (গতকাল) ৬৩৬টি। আর ১০৩টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ৯২টিতে রোগী আছে, খালি আছে ১১টি। এর মধ্যে দুটি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা নেই। বাকি আটটির মধ্যে পাঁচটিতেই সব কটি আইসিইউ বেড পরিপূর্ণ রোগীতে। অন্যদিকে ঢাকার ৯টি বড় বেসরকারি হাসপাতালের তিন হাজার ৩২১টি জেনারেল বেডের মধ্যে দুই হাজার ২৩৩টি রোগীতে পূর্ণ, খালি আছে এক হাজার ৮৮টি। ওই বেসরকারি হাসপাতালগুলোর  ২৬৭টি আইসিইউ বেডের মধ্যে ২১০টিতে রোগী আছে এবং ৫৭টি খালি। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সব মিলিয়ে ১০ হাজার ৫০০টি জেনারেল বেডের মধ্যে সাত হাজার ৫৪৯টি খালি এবং দুই হাজার ৯৫১টিতে রোগী আছে। ৫৪৯টি আইসিইউ বেডের ৩০৬টিতে রোগী আছে এবং ২৪৩টি শূন্য। জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ উদ্দিন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, কুর্মিটোলাসহ যেখানে বেশি জনবল সংকট রয়েছে, সেখানে দু-তিন দিনের মধ্যেই জনবল পোস্টিং দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এরপর সমস্যা কেটে যাবে। এ ছাড়া এরই মধ্যে আরো যে পাঁচটি হাসপাতাল বন্ধ করা হয়েছিল, সেগুলো আবার চালুর প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া রোগী বাড়লেও এখনো হাসপাতালে বহু বেড খালি রয়েছে। রোগীদের উচিত কোনো একটি বা দুটি হাসপাতালের দিকে তাকিয়ে না থেকে যেখানেই বেড খালি থাকবে, সেখানেই চলে যাওয়া।

  • ঢাকা মেডিক্যালে এখনো চাপ বাড়েনি

করোনা মহামারির শুরু থেকে বিরতিহীনভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এর অনেক চিকিৎসক, নার্সও আক্রান্ত হয়েছেন করোনায়। তবে বর্তমানে হাসপাতালে রোগীর চাপ আগের মতো না থাকলেও নার্সদের সেবা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে রোগীর স্বজনরা। তারা বলছে, রোগীর কোনো সমস্যা হলে দেখার জন্য একজন নার্সও খুঁজে পাওয়া যায় না। আর চিকিৎসকদের রুমের সামনে গিয়ে লাইন না ধরলে বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্টও দেখানো যায় না। গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নতুন ভবনের সপ্তম তলায় করোনার লক্ষণ আছে এমন রোগীদের রাখা হয়েছে। একই ধরনের রোগীদের রাখা হয়েছে ভবনের ষষ্ঠ তলায়ও। আর অষ্টম ও নবম তলায় করোনা পজিটিভ রোগীদের রাখা হয়েছে। ওপরের দুই তলায় রোগীর স্বজনদের আনাগোনা কম দেখা গেলেও নিচের দুই তলায় রোগীর স্বজনরা মাস্ক ছাড়াই ঘোরাফেরা করছিল। লালবাগ থেকে রোগী নিয়ে আসা কোয়েল নামের একজন বলেন, ‘ভাই, আমার বাপ অসুস্থ। অবস্থা খুব বেশি ভালো না। করোনার লক্ষণ আছে। মাথা কাজ করতেছে না। এইজন্য মাস্কও পরি নাই।’ হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজন কর্মীকেও মাস্ক ছাড়া দেখা যায়। কেন মাস্ক পরলেন না—এই প্রশ্নের জবাবে নিয়াজ মোর্শেদ নামের একজন বলেন, ‘ভাই, গরম বেশি, তাই মাস্ক পরিনি। তা ছাড়া আমার ভেতরে অ্যান্টিবডি হয়ে গেছে। আমার হবেও না আর আমার মাধ্যমে ছড়াবেও না। দুইবার করোনা পজিটিভ হয়ে ভালো হয়ে গেছি।’ জানা যায়, নতুন ভবনের চারটি ফ্লোরে আট ইউনিটে দুইভাগে প্রায় এক হাজার বেড রয়েছে, যার প্রতিটিতেই রোগী থাকছে। মাঝেমধ্যে কিছু বেড ফাঁকাও থাকছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সেটিতে রোগী চলে আসছে। গতকাল সপ্তম তলার ৭০১ নম্বর ইউনিটে গিয়ে কয়েকটি বেড ফাঁকা দেখা গেছে। এদিকে আগে করোনার সময়ে রোগী বহনে ব্যস্ত সময় পার করা অ্যাম্বুল্যান্সচালকদের কিছুটা অলস দেখা গেছে। আবু মিয়া নামের এক চালক বলেন, ‘ভাই, টিভিতে দেহি করোনা বাইড়া গেছে। কিন্তু রোগী তো পাইতাছি না। আগের চাইতে কেমনে বাড়ছে বুঝতাছি না। বাড়লে তো ভাড়া বেশি পাইতাম।’ ৭১৪ নম্বর কক্ষে করোনার লক্ষণ আছে এমন রোগীদের দেখছিলেন দুই চিকিৎসক। কক্ষের সামনে কয়েকজন খুব বিরক্তিভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। দেলোয়ার নামের একজন বলেন, ‘দুই দিন আগে মায়ের করোনা পরীক্ষার নমুনা নিয়েছে। এখনো রিপোর্ট পাইনি। রিপোর্ট না আসাতে ডাক্তাররা করোনার ওষুধ দিচ্ছেন না। কিন্তু মায়ের সব লক্ষণই তো আছে। কী করব বুঝতে পারছি না।’ আরেক রোগীর স্বজন পাশ থেকে বলে ওঠেন, ‘ভাই, জেনে ভর্তি করার পরও তো ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছে না। ডাক্তারদের কাছে না আসলে উনারা যাইতে চান না। আর নার্সগো তো খুঁইজাই পাই না। করোনা পজিটিভ হওয়ার আগেই উনারা দূরে দূরে থাকেন। উপরে তো (অষ্টম, নবম তলা) তো এখনো যাই নাই। পিপিই পরা অবস্থায় দুই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে করোনা সচেতনতার কারণে দরজার সামনে থাকা ব্যক্তি ভিতরে যাওয়ার সুযোগ দেননি। পরে ৭০১ নম্বর ওয়ার্ডে নার্সদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও রিসেপশনে কাউকে পাওয়া যায়নি।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৮৮৩টি জেনারেল বেডের মধ্যে ৬৯০টিতে গতকাল করোনা রোগী ভর্তি ছিল। ১০টি আইসিইউ বেডের ১০টিই ছিল রোগীতে পূর্ণ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles