শনিবার, জুন ১৯, ২০২১

উন্নয়নের প্রত্যাবর্তন: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার

১৯৮১ সালের ১৩, ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারির কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় শেখ হাসিনাকে। সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দেশে ফিরে আসবেন বলে ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। কিন্তু হন্তারক জিয়াউর রহমান তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

দৃঢ় সংকল্প, দেশে ফেরার অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছা আর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে দেশে আসতে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংস হত্যার প্রায় ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে, সমস্ত প্রতিবন্ধকতার জাল ছিন্ন করে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৮১ সালের ১৭ মে নিজের দেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা।

দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্বজনদের রক্তে রাঙা ৩২ নম্বর বাড়িতে মিলাদ পড়াতে চেয়েছিলেন জননেত্রী। জিয়া সে অনুমতি দেননি। বাধ্য হয়ে রাস্তায় শামিয়ানা টাঙিয়ে মিলাদের ব্যবস্থা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার যেদিন হত্যা করা হয়, বোন শেখ রেহানা, স্বামী ও দুই সন্তানসহ শেখ হাসিনা তখন পশ্চিম জার্মানিতে। দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান তাঁরা।

২৪ আগস্ট সকালে ভারতীয় দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা তাঁদের ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে নিয়ে যান। তবে তাঁদের যাত্রার বিষয়টি ওই সময় গোপন রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে ২৫ আগস্ট সকালে দিল্লি পৌঁছন শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, ওয়াজেদ মিয়া এবং তাঁদের দুই সন্তান। বিমানবন্দর থেকে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় নয়া দিল্লির ডিফেন্স কলোনির একটি বাসায়। তাঁদের জন্য পরামর্শ ছিল এমন- বাসার বাইরে না যাওয়া, ওখানকার কারো কাছে পরিচয় না দেওয়া এবং দিল্লির কারো সঙ্গে যোগাযোগ না রাখা।

ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কোনো খবর ভারতের পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে না। কাজেই তখনকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এক রকম অন্ধকারে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা।

দিল্লিতে পৌঁছনোর দুই সপ্তাহ পর শেখ হাসিনা ও তাঁর স্বামী খ্যাতিমান পরমাণু বিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়া ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে থেকেই শেখ হাসিনা ১৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে পারেন।

১৬ মে শেখ হাসিনা ও তাঁর মেয়ে দিল্লি থেকে একটি ফ্লাইটে কলকাতা পৌঁছন। ১৭ মে বিকালে তাঁরা কলকাতা থেকে পৌঁছন ঢাকায়। সেদিন ছিল দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া; সারা দিন প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি। সেসব উপেক্ষা করে হাজার হাজার জনতা জড়ো হয়েছিল তেজগাঁওয়ের পুরনো বিমানবন্দরে। পুরো এলাকা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত। ‘হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, পিতৃ হত্যার বদলা নেব।’, ‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ছিল এলাকা।

ক্ষমতার দখলদার  রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রের নামে গণতন্ত্রকেই বন্দুকের নলে হত্যা করে স্বৈরতন্ত্র চালু করেছিলেন তখন; মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশকে নতুন করে পাকিস্তানি আদর্শে পরিচালনা করছিলেন। ফলে ১৭ মে কেবল শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল না, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, বিচারহীনতা ও উন্নয়নের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।’

বিমানবন্দর থেকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে যাওয়া হয় মানিক মিয়া এভিনিউতে, সেখানে লাখো জনতার সামনে শেখ হাসিনা হৃদয়বিদারি কণ্ঠে বলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই। আমার আর হারাবার কিছুই নেই।

১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পর থেকে বিএনপি-জামাত, স্বাধীনতাবিরোধী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে বারবার। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বৃষ্টির মতো গ্রেনেড ছুঁড়েও তাঁকে হত্যার অপচেষ্টা চালানো হয়। সর্বশেষ গত ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়।

২০১৫ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে আওয়ামী লীগের মুখপত্র ‘উত্তরণ’ এর  রিপোর্টে  প্রকাশিত হয়। বারবার মৃত্যুর উপত্যকা থেকে ফিরেও মৃতুঞ্জয়ী শেখ হাসিনা বিচলিত নন, দ্বিধান্বিত নন, বরং নতুন উদ্যামে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি, একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি ও সমুদ্রবক্ষে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ব্লু-ইকোনমির নবদিগন্ত উন্মোচন, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, সাবমেরিন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন নতুন উড়াল সেতু, মহাসড়কগুলো ফোর লেনে উন্নীত করণ, এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, ফোর-জি মোবাইল প্রযুক্তির ব্যবহার চালুসহ অসংখ্য ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। সন্ত্রাস এবং জঙ্গি দমনেও সফল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

মিয়ানমারে জাতিগত দাঙ্গায় পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েও মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। এ পর্যন্ত শেখ হাসিনা অর্জিত আন্তর্জাতিক পদক ও পুরস্কারের সংখ্যা ৩৯টি।

বৈশ্বিক মহামারি করোনায় শেখ হাসিনার নেওয়া পদক্ষেপ জাতিসংঘ, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী ফোর্বসসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে সৎ এই পাঁচজন সরকার প্রধানের তালিকায় তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়কই নন- নিজের সততা, যোগ্যতা ও কর্ম প্রচেষ্টায় আজ বিশ্বনেত্রী, বিশ্বের এক অনুকরণীয় নেতৃত্বের আদর্শ।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Stay Connected

22,042FansLike
0FollowersFollow
0SubscribersSubscribe
- Advertisement -

Latest Articles